
তেহরান, ০৩ মে – যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত, দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ সংকটের প্রভাবে ইরানের অর্থনীতি ভয়াবহ চাপে পড়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং মুদ্রার তীব্র অবমূল্যায়নে দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
স্থানীয় বাজার পরিস্থিতি বলছে, খাদ্য ও ওষুধ থেকে শুরু করে গাড়ি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, এমনকি পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য—প্রায় সবকিছুর দামই হু হু করে বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সপ্তাহের ব্যবধানে পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে নজিরবিহীন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। স্থানীয় অব্যবস্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে ধারাবাহিক হামলা, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং নৌ-অবরোধের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেট কার্যত বন্ধ থাকাও অর্থনীতিকে আরও বিপর্যস্ত করেছে। প্রায় ৯ কোটির বেশি মানুষের এই দেশটি এখন গভীর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
মুদ্রাবাজারেও অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দরপতন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজধানী তেহরানের খোলা বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ১৮ লাখ ৪০ হাজার রিয়াল লেনদেন হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মুদ্রা কেনাবেচাও প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়া বা অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ফলে অনেক বিক্রেতা দ্রুত দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ পণ্য বিক্রিই করতে চাইছেন না। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে রয়েছেন—এখন কিনবেন, নাকি অপেক্ষা করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।
উদাহরণ হিসেবে প্রযুক্তি পণ্যের বাজারে দেখা যাচ্ছে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। iPhone 17 Pro Max-এর ২৫৬ গিগাবাইট সংস্করণ যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে প্রায় ১২০০ ডলারে পাওয়া যায়, সেখানে তেহরানের বাজারে সেটির দাম পৌঁছেছে প্রায় ২৭৫০ ডলারে। অনেক বিক্রেতা আবার পণ্য মজুত রেখেই বিক্রি স্থগিত রেখেছেন।
গাড়ির বাজারেও একই চিত্র। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জনপ্রিয় মডেল Peugeot 206 কিনতে এখন খরচ পড়ছে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ ডলার সমপরিমাণ রিয়াল, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। আমদানিকৃত গাড়ির দাম আরও বেশি, এবং সেগুলোর প্রাপ্যতাও অত্যন্ত সীমিত।
অন্যদিকে, পার্শ্ববর্তী সংযুক্ত আরব আমিরাত -এর বাজারে একই গাড়ি ইরানের তুলনায় অনেক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে, যা দুই দেশের বাজারের বৈষম্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পরিস্থিতির জন্য ‘মনস্তাত্ত্বিক কারণ’ ও অতিরিক্ত মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের দায়ী করলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকৃত সংকটের মূল কারণ কাঠামোগত অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং বহিরাগত চাপ।
মজুরি বৃদ্ধি করেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। নতুন পারস্য বছরে সরকার প্রায় ৬০ শতাংশ মজুরি বাড়ালেও ন্যূনতম মাসিক আয় এখনো ৯২ ডলারের নিচে। পাশাপাশি খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে সরকারের ভর্তুকিও মাসে ১০ ডলারের কম, যা বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে কার্যত অপ্রতুল।
এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। তেহরানের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দাম আর আয়ের মধ্যে কোনো মিল নেই। যা আছে, তা দিয়ে হয় এখনই কিছু কিনে ফেলতে হবে, নইলে পরে হয়তো কেনাই সম্ভব হবে না।”
এদিকে যুদ্ধের প্রভাবে ব্যাপক হারে কর্মসংস্থানও সংকুচিত হচ্ছে। প্রযুক্তি খাত থেকে শুরু করে ইস্পাহানের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পর্যন্ত কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি মাসুদ পেজেসকিয়ান -এর সরকার।
এর মধ্যেই দেশের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, সামরিক ক্ষেত্রে ইরান তার সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে এবং এখন অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও শত্রুদের পরাজিত করতে হবে। তিনি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্মী ছাঁটাই না করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “ইরান উন্নতি ও অগ্রগতির চূড়ার পথে রয়েছে।”
তবে বাস্তবতা বলছে, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা এবং বাজার অস্থিরতার সম্মিলিত চাপে ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে গভীর সংকটে নিমজ্জিত, যার সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছেন সাধারণ নাগরিকরা।
এনএন/ ০৩ মে ২০২৬




