বিঘ্ননাশের প্রার্থনায় ইসকন সিলেট: নৃসিংহ চতুর্দশীতে ভক্তদের ঢল

বিঘ্ননাশের প্রার্থনায় ইসকন সিলেট: নৃসিংহ চতুর্দশীতে ভক্তদের ঢল

সকালের আলো ফোটার আগেই ভক্তদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ইসকন সিলেট মন্দির প্রাঙ্গণ। আলোকসজ্জা, ফুলের সাজ আর উৎসবমুখর পরিবেশে সেজে ওঠে পুরো মন্দির প্রাঙ্গণ।করতাল,হারমোনিয়াম আর মৃদঙ্গের ছন্দে ভেসে আসে “কীর্তনের” ধ্বনি। ভক্তবৎসল ভগবান শ্রীনৃসিংহদেবের আবির্ভাব তিথি—নৃসিংহ চতুর্দশীকে ঘিরে এখানে দিনব্যাপী চলে ভক্তদের সেবা, প্রার্থনা আর আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য মিলনমেলা।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ইসকন সিলেট মন্দিরে নৃসিংহ চতুর্দশী উপলক্ষে দিনব্যাপী নানা ধর্মীয় আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকে ভক্তদের আগমনে মন্দির প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে, যেখানে কীর্তন, যজ্ঞ, আলোচনা সভা ও মহাভিষেককে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

বৈদিক শাস্ত্রমতে, শ্রীনরসিংহদেব হচ্ছে ভক্তবৎসল ও বিঘ্ননাশকারী। তাই জীবনের পারমার্থিক, জাগতিক নানা সংকট, ভয় ও অশুভ শক্তি থেকে মুক্তির আশায় ভক্তরা এদিন তাঁর শরণ নেন। সকাল থেকেই নারী, পুরুষ, শিশু—সব বয়সী মানুষের ভিড়ে মন্দির প্রাঙ্গণ পরিণত হয় এক ভক্তস্রোতে।

অমল পুরাণের সেই চিরন্তন কাহিনি—ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করতে ভগবান শ্রীবিষ্ণু নৃসিংহ রূপে আবির্ভাব—আজও ভক্তদের মনে জাগায় অটল বিশ্বাস। অর্ধেকমানব-অর্ধেকসিংহ রূপে অসুররাজ হিরণ্যকশিপুকে বিনাশের সেই লীলা ধর্ম প্রতিষ্ঠা ও ভক্তরক্ষার প্রতীক হয়ে আছে যুগে যুগে। বৈশাখ মাসের শুক্লা চতুর্দশীতে সেই ঐশ্বরিক মুহূর্তকে স্মরণ করেই পালিত হয় এই তিথি।

দিনজুড়ে ইসকন মন্দিরে ছিল কীর্তনমেলা, যজ্ঞ, আলোচনা সভা ও মহাভিষেকের আয়োজন। কীর্তনমেলার সুরে ভক্তরা যেন ভেসে যাচ্ছিলেন অন্য এক জগতে। আর মহাভিষেকের সময় হাজারো কণ্ঠে একসঙ্গে উচ্চারিত প্রার্থনা যেন ছুঁয়ে যাচ্ছিল আকাশ। অনেক ভক্ত চোখ বন্ধ করে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন, কেউবা হাতজোড় করে নীরবে নিবেদন করছেন নিজের মনের কথা ভক্তবৎসল ভগবান নৃসিংহদেবের কাছে।

এরপর ইসকন সিলেট মন্দিরের অধ্যক্ষ ও ইসকন বাংলাদেশের সহ-সভাপতি শ্রীমৎ ভক্তি অদ্বৈত নবদ্বীপ স্বামী মহারাজ নৃসিংহ লীলার তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, ভক্তির শক্তিই মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। ভক্ত প্রহ্লাদের মতো দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতাই অতিক্রম করা সম্ভব—এই বার্তাই দেয় নৃসিংহ চতুর্দশী।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে মন্দিরে শুরু হয় গৌর সুন্দরের আরতি। প্রদীপের আলো, ঘণ্টাধ্বনি আর কীর্তনের সুরে সৃষ্টি হয় এক মুগ্ধকর পরিবেশ। এরপর নৃসিংহ আবির্ভাব লীলা পাঠের মধ্য দিয়ে দিনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।

শেষপর্বে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয় অনুকল্প প্রসাদ। দীর্ঘ সময় ধরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ভক্তরা প্রসাদ গ্রহণ করেন—যেন ভক্তি ও সমতার এক সুন্দর প্রতীক।

ভক্তদের মতে, নৃসিংহ চতুর্দশী শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি আত্মশুদ্ধি ও অন্তর্জাগরণেরও একটি উপলক্ষ। এই দিনের উপবাস, নামসংকীর্তন ও প্রার্থনা মানুষকে ভেতর থেকে শক্তি জোগায়, দূর করে ভয় ও অশুভ প্রভাব।

ডিএস/এফআর/এসএ

Explore More Districts