স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরেও ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ স্বীকৃতি পাননি দেওয়ানগঞ্জে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনকারী শহীদ ছানা – দৈনিক আজকের জামালপুর

স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরেও ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ স্বীকৃতি পাননি দেওয়ানগঞ্জে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনকারী শহীদ ছানা – দৈনিক আজকের জামালপুর




স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরেও ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ স্বীকৃতি পাননি দেওয়ানগঞ্জে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনকারী শহীদ ছানা – দৈনিক আজকের জামালপুর



খাদেমুল ইসলাম
স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরেও ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ স্বীকৃতি পাননি দেওয়ানগঞ্জে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনকারী শহীদ ছানা। এলাকাবাসীর দাবি, বীরমুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও স্মৃতিরক্ষার্থে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও কমপ্লেক্স স্থাপন। ১৪ মার্চ ১৯৭১। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে উত্তাল। পাক শাসকের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিক্ষোভ। রণপ্রস্তুতি। টানটান উত্তেজনা সর্বত্র। তদানীন্তন ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহকুমার দেওয়ানগঞ্জ থানায় বিপুল সংখ্যক অবাঙালি বিহারীদের বসবাস। সেইসাথে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রও। কারও বুকে সাহস নাই পাক শাসকের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার। ভয়ে কম্পমান মানুষ। এমনি এক সময়ে অর্থাৎ ১৪ মার্চ একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী ও বিহারী অধ্যুষিত দেওয়ানগঞ্জের বেলতলী বাজার রেল ক্রসিং স্থানে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দেন স্থানীয় গুজিমারী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী ও তুখোর ছাত্রনেতা আনোয়ারুল আজীম ছানা। তার পিতা মরহুম আলহাজ্জ্ব আলতাফ হোসেন ছিলেন একজন ঊর্ধ্বতন কাস্টমস কর্মকর্তা। তিনি শতাধিক মানুষের সামনেই দেওয়ানগঞ্জে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। শহীদ ছানার ছোট ভাই ঢাকার প্রগতি লাইফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জালালুল আজিম চিশতী এ সাংবাদিককে জানান, সেদিন তিনি তার নিজ হাতের লেখা একটি শপথ বাক্য পড়ে শোনান। লেখা ছিল- স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন, ১৪ মার্চ, ৭১। যে রক্ত খচিত পতাকা আজ আমরা উত্তোলন করলাম, দেহে একবিন্দু রক্ত থাকা পর্যন্ত স্বাধীন বাংলার এই জাতীয় পতাকা সামান্যতম অবমাননা সহ্য করব না। এদেশ আজ স্বাধীন। পতাকা উড়বেই। প্রয়োজন হলে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের এই পবিত্র পতাকার মর্যাদা রক্ষা করবো।

তার এই দুঃসাহসিকতার কথা ছড়িয়ে পড়ে মহকুমা ছাড়িয়ে জেলাজুড়ে। বাহবা দেয় অসংখ্য মানুষ। কেউবা ভয় দেখায়, তিনি যেন এলাকা ছেড়ে নিরাপদে অন্যত্র চলে যান। কেউ বলে আত্মগোপনে যেতে। কিন্তু অকুতোভয় স্বাধীনচেতা দেশপ্রেমিক ছাত্রনেতা ছানা কোথাও যাননি। বলেছেন, আমি কোনো দোষ করিনি। আমি ন্যায়ের পক্ষে রয়েছি, জাতির পক্ষে কাজ করেছি। এরপর দিন যায়। কিছুদিনের মধ্যেই দেওয়ানগঞ্জে প্রবেশ করে পাক হানাদার বাহিনী। দেওয়ানগঞ্জে ওয়াপদা, জিল বাংলা চিনিকল, বাহাদুরাবাদ ঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে সেনাক্যাম্প স্থাপন করে পাক বাহিনী। স্থানীয় স্বাধীনতাবিরোধী ও অবাঙ্গালীরা ছানার এসব কথা পাক হানাদার বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেয়। কোনো একদিন ছানার গ্রামের বাড়ী দেওয়ানগঞ্জের বাদেশশারিয়াবাড়ী (গুজিমারী) বর্তমান আজিমনগর একদল পাক হানাদার বাহিনী ঘিরে ফেলে। ধরে নিয়ে যায় ছানাসহ আরও অনেককেই। মৃত্যুপুরী বলে কুখ্যাত ক্যাম্প বাহাদুরাবাদ ঘাটে নিয়ে গিয়ে অমানবিক অত্যাচার চালায় সবার ওপর। তন্মধ্যে ছানাকে পৈশাচিক নির্যাতন চালায়। মুমূর্ষু অবস্থায় ছানাকে পরদিন ছেড়ে দেয়া হলেও তাকে নজরবন্দী করে রাখা হয় তাদের বাড়িতে। যাতে করে তিনি কোনো চিকিৎসা নিতে না পারেন। এরপর বলা যায় বিনা চিকিৎসায় ধুকেধুকে নিদারুণ কষ্টভোগের মাধ্যমে ৬ মে ১৯৭১ সালে শহীদ হন আনোয়ারুল আজিম ছানা। তার স্মৃতি রক্ষার্থে বেলতলী বাজার রেলক্রসিং স্থানে যেখানে পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল সেখানে সরকারি উদ্যোগে নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ ছানা স্মৃতিস্তম্ভ, রেলস্টেশন-বেলতলী বাজার রোডে শহীদ ছানা গেটসহ নানা স্মৃতিস্তম্ভ পুরো দেওয়ানগঞ্জবাসীকে ওইদিনের বিভৎস ঘটনা হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়। তার গ্রাম গুজিমারীকে এলাকাবাসী তার নামানুসারে নাম রেখেছেন আজিমনগর। এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি, দেওয়ানগঞ্জে মহান মুক্তিযুদ্ধকালে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনকারী শহীদ আনোয়ারুল আজিম ছানাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি স্বীকৃতিদান এবং তার কবরস্থানে সরকারি ব্যয়ে একটি কমপ্লেক্স ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর স্থাপনের। এ ব্যাপারে এলাকার হাজারো মানুষ জোর দাবি জানাচ্ছেন, সরকারের কাছে।


Explore More Districts