গত আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে রাউজান বিসিক (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কুটির শিল্প কর্পোরেশন) শিল্প নগরীর বিশাল এলাকা। এরই মধ্যে ধসে পড়েছে সীমানা প্রাচীর, ভিতরের ভরাট মাটি বৃষ্টির পানির কারণে নিচে নেমে যাচ্ছে। রাস্তাগুলো ঢেকে গেছে ঝোপঝাঁড়ে।
জানা যায়, ২০২১ সালে ৫০ থেকে ৭০ হাজার বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৃহত্তর পার্বত্য জেলায় উৎপাদিত ফলমূল প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করার লক্ষ্য নিয়ে রাউজানে এই শিল্প নগরীর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ৭৯ কোটি ৮৪ হাজার টাকার বিসিক শিল্প নগরী প্রকল্পে ১৮৪টি শিল্প প্লট তৈরি করে শিল্প উদ্যোক্তাদের দেয়ার কথা ছিল। তবে ২০২১ সাল থেকে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এখনো পরিবেশ অধিদপ্তরের চাহিদা অনুসারে এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এ কারণে পায়নি পরিবেশ সনদও।
স্থানীয় সূত্রে জানায়, পাঁচ বছর আগে এই প্রকল্পের সূচনা করার পর থেকে কাজ চলছিল ভালভাবে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে এসে নানা কারণে প্রকল্প কাজে ছন্দপতন ঘটে। সেই থেকে স্থবিরতার মধ্যে প্রকল্প এলাকাটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
বিসিকের সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এই প্রকল্প কাজের গতি কমতে শুরু করে ২০২৩ সাল থেকে। ওই সময়ের ক্ষমতাসীন নেতাকর্মীদের নানামুখী প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা, দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারের নানা আবদারে কাজের স্থবিরতা আসে। এরই মধ্যে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। এসব কারণে রাউজানের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটির কাজ এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা ছিল সিদ্ধান্তহীনতায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিসিক কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলদের উদাসীনতার কথা তুলে ধরে সূত্র জানায়, বিসিক কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় এখনো রাউজান শিল্পাঞ্চলের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশ সনদ নেওয়া হয়নি। ২০২১ সালে প্রকল্প কাজ শুরুর পর থেকে ২০২৩ সালের শেষ সময় পর্যন্ত প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ, মাটি ভরাট, সীমানা প্রাচীর, রাস্তা নির্মাণ, বিদ্যুৎ সাবস্টেশন, গ্যাস লাইন নির্মাণ কাজ শেষ করেছে কর্তৃপক্ষ। শুধু বাকি আছে শিল্প প্লট তৈরি করে শিল্প উদ্যোক্তদের বরাদ্দ দেয়াসহ ছোটখাট কিছু কাজ।
গত সোমবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, রাউজান সদর ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বাংশের জঙ্গল মৌজায় ৩৫ একর জায়গা জুড়ে থাকা শিল্পাঞ্চালের কয়েকটি স্থানে সীমানা প্রাচীর ধসে পড়েছে। বৃষ্টির পানিতে প্রকল্প এলাকার মাটি প্রাচীরের নিচ দিয়ে বাইরে নেমে গেছে। ভিতরের সব রাস্তা ঝোপঝাড়ে ডেকে আছে।
এ সময় স্থানীয়রা বলেন, শুরুতে শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার কর্মযজ্ঞ দেখে রাউজানসহ আশে পাশের উপজেলার মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল। স্বপ্ন দেখেছিল এলাকার মানুষ বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাবে। সেখানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফলমূল এই শিল্পাঞ্চলের প্রক্রিয়াজাত কারখানাগুলোতে সরবরাহ করে লাভবান হবে। গত আড়াই বছর ধরে প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকায় এলাকার মানুষ হতাশ হয়েছে। তবে তারা আশা ছাড়েননি। তারা বলেন, রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী শিল্পাঞ্চল প্রকল্পটির কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেবেন।
রাউজান বিসিক শিল্পাঞ্চলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে সংস্থাটির চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপমহাব্যবস্থাপক এস এম এম আলমগীর আল কাদেরী বলেন, প্রকল্পের সীমানা প্রাচীর ও মাটি ধস হয়েছে। এই ধসের জন্য তিনি ওই কাজের ঠিকাদার মেসার্স বোস্তামী নামের একটি জয়েন্টভেঞ্চার প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে বলেন, তারা নিম্নমানের কাজ করার কারণে ধসের ঘটনা ঘটেছে। এই কর্মকর্তা জানান, ধসের বিষয়টি ঠিকাদারকে জানিয়ে একাধিকবার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তাগাদা দেয়া হয়েছিল। সর্বশেষ তাদের সাড়া না পেয়ে জামানতের টাকা জব্দ করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না পাওয়া ও প্রকল্পের কাজ আবার শুরু কখন করা হবে–এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, প্রকল্পের কিছু এলাকায় ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট করা আছে। পরিবেশে অধিদপ্তরের চাহিদা কেন্দ্রীয় ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট করতে হবে, কেন্দ্রীয় ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এখন যেসব প্রকল্পে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট রাখা আছে সেগুলো দিয়ে বেশ কয়েকটি শিল্প কারখানা চালানো যাবে। নতুন করে কাজ কখন শুরু করা হবে–জানতে চাইলে তিনি বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে, ইতোমধ্যে তারা উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করেছে। রাউজানের বিসিকের প্রকল্পের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে।


