কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতের মধ্যে ছয়জন এক পরিবারের। নিহতরা সবাই পর্যটক ছিলেন। এদের মধ্যে চারজনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। এই ঘটনায় রিসোর্টটিতে অবস্থিত রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। গতকাল শনিবার সকাল পৌনে ৭টার দিকে ইনানীর পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রিসোর্টে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা ঘটে। আগুনে রিসোর্টটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। অগ্নিকাণ্ডের শিকার এই রিসোর্টটি কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে পাটুয়ারটেক এলাকায় কক্সবাজার–টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের পাশে অবস্থিত। দোতলা কাঠামোটির এক পাশে ইটের পাকা দেয়াল এবং বাকিটা কাঠ, বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি।
নিহতদের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া ছয়জনের মধ্যে একজন শিশু, চারজন নারী ও একজন পুরুষ রয়েছেন। তারা হলেন ঢাকার রামপুরা–বনশ্রী এলাকার আশিকুল ইসলামের স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা, তার শ্যালিকা লায়লা জাহান নাবিলা, মিলিতা মেহজাবিন আলভি ও ফারিহা কবির, পরিবারের সদস্য নাফিস তেহামী ও শিশু ফায়িজান আহমদ।
নিহতদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ও ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন করে রয়েছেন। তারা একই পরিবারের। গতকাল এ ঘটনায় তিন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শোক জানিয়েছে। এদের মধ্যে নাফিজ তেহামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী। লায়লা জাহান নাবিলা নামে আরেকজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। আর মিলিতা মেহজাবিন আলভি ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ সায়েন্সেসের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী।
স্বজনরা বলছেন, পরিবারটি বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে যান। গতকাল তাদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। সেভাবেই তারা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার আগে অগ্নিকাণ্ড সব তছনছ করে দেয়।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপ–সহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বেলা ১১টার দিকে জানান, টুপটুপ নামে একটি রিসোর্টে আগুন লেগেছে বলে ৭টা ২৩ মিনিটের দিকে তারা খবর পান। ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করেন। সোয়া ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। এরপর দ্রুত আটকে পড়াদের উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেন। আগুনে পুড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত রিসোর্টের ভেতর থেকে দুপুরে প্রথম ধাপে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আহত অবস্থায় ছয়জনকে উদ্ধার করে হাসপাতাল পাঠানো হয়। এরপর দ্বিতীয় ধাপে তল্লাশি চালিয়ে রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপ টপকে দুটি টয়লেট থেকে আরো চারটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার জানান, শুক্রবার রাতে ওই রিসোর্টে ২১ জন মতো পর্যটক ছিল বলে জানতে পারি। এর মধ্যে দুইজন চেকআউট করে চলে গিয়েছিল। ফলে সর্বশেষ ১৮ জনের মতো ছিল বলে নিশ্চিত হওয়ায় যায়। এর মধ্যে ১০ ভেতরে আটক পড়ে আগুনে পুড়ে মারা যায়। ছয়জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। বাকিরা সকালে ঘুরতে বের হয়ে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান।
যেভাবে আগুনের সূত্রপাত : ভোর পেরিয়ে সকাল হতেই এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি দেখতে পান স্থানীয়রা। মুহূর্তের মধ্যে দাউ দাউ জ্বলে উঠে আগুনের লেলিহান শিখা। কাঠ–টিনের অবকাঠামো থাকায় দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো রিসোর্টে একযোগে আগুন ধরে যায়। আগুনের তীব্রতার কারণে আশপাশে যাওয়ার সুযোগ ছিল না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পুড়ে যাওয়া রিসোর্টের পাশের দোকানের মালিক গিয়াস উদ্দিন বলেন, সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মতো শব্দ শুনি আমরা। এরপর মুহূর্তের মধ্যে দেখতে পাই দাউ দাউ আগুন জ্বলছে। পুরো রিসোর্টে আগুন ধরে গেছে। এ সময় রিসোর্টে থাকা পর্যটকদের কান্নাকাটি, দৌড়ঝাঁপ দেখতে পাই। কিন্তু আগুন আর ধোঁয়ার কুণ্ডুলীতে সেখানে প্রবেশ করে লোকজনকে উদ্ধার করা সম্ভব ছিল না।
রিসোর্টের পেছন এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম মনে করেন, রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটতে পারে। এরপর সেখানে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটেছে। তবে রিসোর্টের কর্মীরা তাৎক্ষণিক সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, একটি ফ্রিজ থেকে শর্টসার্কিট হয়ে আগুন ধরে। ফ্রিজটি রান্নাঘরে ছিল। এরপর আগুন ছড়িয়ে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে এবং একের পর এক এসি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে আগুন আরো বড় আকারে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
যেভাবে প্রাণে রক্ষা পান অন্যরা : রিসোর্টটির দেয়াল ও মেঝে ইট, কাঠ ও টিন দিয়ে তৈরি ছিল। তবে তিনতলা এই রিসোর্টের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার অধিকাংশ অবকাঠামো ছিলো কাঠ ও টিনের। এছাড়া সড়ক থেকে রিসোর্টের প্রবেশের সিঁড়ি ছিল কাঠের। দ্রুত আগুন ধরে সিঁড়ি পুড়ে যায়। এতে অতিথিরা নিচে নামতে পারেননি বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। ভয়ে অনেকে টয়লেটে ঢুকে পড়ে। তবে তারা রক্ষা পাননি। শুধুমাত্র দোতলার জানালা দিয়ে পেছনের নালায় লাফ দিয়ে রক্ষা পেয়েছেন আহত হওয়া ছয়জন।
তদন্ত কমিটি গঠন : অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ধারণা করা হচ্ছে রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত। কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি আগুনের সূত্রপাত, নিহত–আহতদের বিষয়ে সার্বিক তথ্য এবং অন্যান্য বিষয়ে তদন্ত করে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। এরপর প্রয়োজনীয় আইন পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলবে বলে মনে করছি।
উদ্ধার কার্যক্রম শেষে সন্ধ্যা ৬টার দিকে একটি ট্রাকে বহন করে মরদেহগুলো কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। মরদেহগুলো হাসপাতালে মর্গে রাখা হয়েছে। তবে নিহত ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেলেও বাকি চারজনের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, নিহত চারজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাদেরকে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করার প্রয়োজন হবে। সেভাবে প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হচ্ছে।
জানা গেছে, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর মোহাম্মদ তানভীর তার মায়ের ওয়ারিশদের কাছ থেকে ২০ শতক জমি কিনে রিসোর্টটি করেন।
ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে প্রতিনিধিদল পাঠানোর নির্দেশ : বিডিনিউজ জানায়, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিরূপণ, প্রকৃত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও পর্যটকদের সহায়তায় একটি প্রতিনিধিদল পাঠাতে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডকে নির্দেশ দিয়েছেন বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। গতকাল বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মন্ত্রী। অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিনিধিদল পাঠানো ছাড়াও মন্ত্রী বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডকে তাৎক্ষণিক কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
ভবিষ্যতে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃক্সখলা বাহিনী ও পর্যটন খাতের অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে জরুরি সভা আয়োজন এবং সভার সুপারিশকৃত কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করার কথা বলেছেন তিনি। এছাড়া দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর কর্মকর্তা–কর্মচারীদের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহায়তায় অগ্নি–নিরাপত্তা জোরদারকরণ এবং জরুরি উদ্ধারবিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালুর নির্দেশনা দেন তিনি।


