স্বস্তির বাহন যখন ভোগান্তির কারণ/কুষ্টিয়াসহ সারাদেশে অটোরিকশা-বাস্তবতা

ড.আমানুর আমান
একসময় শহরের রাস্তায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছিল স্বস্তির নাম। কম ভাড়ায়, অল্প সময়ে, পাড়া-মহল্লা থেকে বাজার, হাসপাতাল কিংবা বাসস্ট্যান্ড—প্রায় সব জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার সহজ মাধ্যম হিসেবে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য অটোরিকশা হয়ে ওঠে গণপরিবহনের বিকল্প। একই সঙ্গে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের পথও খুলে দেয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ইতিবাচক চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। অটোরিকশা এখন শুধু পরিবহনের মাধ্যম নয়; অনেক শহরে এটি নগর ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ। কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরের ব্যস্ত সড়ক, বাজার ও মোড়ে দাঁড়ালে মনে হয়—রাস্তা যতটা গাড়ির জন্য, তার চেয়ে বেশি যেন গাড়িই রাস্তার জন্য।
একটি একটি করে অটোরিকশা যখন রাস্তায় নামে, তখন সেটি সমস্যা নয়। কিন্তু একই শহরের ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অটোরিকশা যখন একই সময়ে একই সড়কে চলাচল করে, তখন ব্যক্তিগত সুবিধা মিলিয়ে সামষ্টিক অসুবিধা তৈরি হয়। এটাই এখন মূল প্রশ্ন।
সোমবার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইককে নিয়ন্ত্রণে আনতে নতুন নীতিমালা করা হয়েছে। নির্ধারিত রুটে চলাচল, প্রধান সড়কে নিষেধাজ্ঞা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও কিউআর কোডের মাধ্যমে যান শনাক্তকরণ এবং নিরাপদ ব্যাটারি ব্যবহারের মতো বিষয় এতে রাখা হয়েছে। অতীতে একটি নিবন্ধনের বিপরীতে একাধিক যান চলার অভিযোগও উঠে এসেছে।
নীতিমালার উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—নীতিমালা থাকলেই কি শহরের যানজট কমবে?
আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু আইন বা নীতিমালা দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, রুট ব্যবস্থাপনা, চালকের প্রশিক্ষণ, পার্কিং ব্যবস্থা এবং কঠোর প্রয়োগ—সবকিছুর সমন্বিত উদ্যোগ।
অটোরিকশা সমস্যা নয়, অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশাই সমস্যা
অটোরিকশাকে এক কথায় ‘অভিশাপ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এর সঙ্গে মানুষের জীবিকা জড়িত। যে ব্যক্তি নিজের সামান্য সঞ্চয়, ঋণ কিংবা ধারদেনা করে একটি অটোরিকশা কিনেছেন, তার কাছে এটি কোনো যানজটের পরিসংখ্যান নয়—এটি তার সংসার চালানোর অবলম্বন।
তাই হঠাৎ করে অটোরিকশা উচ্ছেদ করার দাবি যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি ‘মানুষের জীবিকা আছে’—এই যুক্তিতে অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণের সুযোগ দেওয়াও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো দুটো স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। একদিকে চালকের জীবিকা, অন্যদিকে লাখো মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচলের অধিকার।
প্রশ্নটা তাই ‘অটোরিকশা থাকবে কি থাকবে না’—এমন নয়। প্রশ্ন হলো, কতগুলো থাকবে, কোথায় চলবে, কখন চলবে এবং কীভাবে চলবে।
কুষ্টিয়ার শহরকে আগে শহর হিসেবে ভাবতে হবে
কুষ্টিয়ার মতো জেলা শহরের বাস্তবতা একটু ভিন্ন। এখানে বড় শহরের মতো প্রশস্ত সড়ক নেই, আবার জনসংখ্যা ও যানবাহনের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বাজার এলাকা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক এলাকায় একই সময়ে রিকশা, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি, পণ্যবাহী যান—সবকিছু ঢুকে পড়ে।
এর মধ্যে অটোরিকশার একটি বিশেষ সমস্যা হলো এর চলাচলের ধরন। যাত্রী ওঠানামার জন্য যেখানে-সেখানে থামা, রাস্তার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা, একে অন্যকে ওভারটেক করা, মোড়ে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো—এসব যানজটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
একটি অটোরিকশা যখন রাস্তার পাশে থামে, তখন হয়তো দুই মিনিটের জন্য মাত্র কয়েক ফুট জায়গা দখল করে। কিন্তু পেছনে যদি ২০টি যান আটকে যায়, সেই দুই মিনিটের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে কয়েকশ মিটার পর্যন্ত।
অর্থাৎ যানজট তৈরির জন্য শুধু গাড়ির সংখ্যা দায়ী নয়; গাড়ি ব্যবহারের শৃঙ্খলার অভাবও সমান দায়ী।
সমাধানের প্রথম ধাপ: শহরের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ
একটি শহরে কতগুলো অটোরিকশা চলবে—এই প্রশ্নের উত্তর অনুমানের ভিত্তিতে দেওয়া উচিত নয়। শহরের রাস্তার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, জনসংখ্যা, দৈনিক যাত্রীচাপ, গণপরিবহনের বিকল্প এবং ব্যস্ত সময়ের যান চলাচল বিশ্লেষণ করে একটি সর্বোচ্চ অনুমোদিত সংখ্যা নির্ধারণ করা দরকার।
যতগুলো গাড়ি এখন রাস্তায় আছে, তার সবগুলোকে বৈধতা দেওয়ার অর্থ নিয়ন্ত্রণ নয়। বরং সেটি হবে বর্তমান বিশৃঙ্খলাকে স্থায়ীভাবে স্বীকৃতি দেওয়া।
নিবন্ধন থাকতে হবে, কিন্তু নিবন্ধনের অর্থ এই নয় যে শহরের রাস্তায় অসীমসংখ্যক যান নামানো যাবে।
দ্বিতীয় ধাপ: রুটভিত্তিক চলাচল
সব অটোরিকশাকে শহরের সব রাস্তায় চলার অনুমতি দেওয়া কেন হবে?
প্রধান সড়কে বড় বাস ও অন্যান্য যান চলাচলের জন্য জায়গা রাখতে হবে। অটোরিকশার জন্য নির্ধারিত করা যেতে পারে ফিডার রুট—অর্থাৎ আবাসিক এলাকা থেকে বাজার, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন কিংবা প্রধান সড়কের নির্দিষ্ট পয়েন্ট পর্যন্ত।
শহরের ভেতরের ছোট সড়কে অটোরিকশা চলবে, কিন্তু নির্দিষ্ট জায়গার পর প্রধান সড়কে প্রবেশ সীমিত থাকবে।
এতে অটোরিকশা বন্ধ হবে না; বরং এর ব্যবহার আরও সংগঠিত হবে।
তৃতীয় ধাপ: স্টপেজ ও পার্কিং—‘যেখানে খুশি’ নয়
কুষ্টিয়াসহ জেলা শহরগুলোর অন্যতম বড় সমস্যা হলো নির্দিষ্ট স্টপেজের অভাব। যাত্রী যেখানে হাত তুলছেন, সেখানেই গাড়ি থামছে। ফলে পেছনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে।
প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নির্দিষ্ট অটোরিকশা স্টপেজ করতে হবে। যাত্রী ওঠানামা সেখানেই হবে। একইভাবে বাজার বা টার্মিনাল এলাকায় অটোরিকশার জন্য আলাদা অপেক্ষমাণ স্থান থাকতে হবে।
রাস্তা পার্কিংয়ের জায়গা নয়—এই মৌলিক ধারণাটি আমাদের নগর ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠিত করা জরুরি।
চতুর্থ ধাপ: লাইসেন্স মানেই চালানোর যোগ্যতা নয়
অটোরিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চালকদেরও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে।
প্রশিক্ষণ ছাড়া, ট্রাফিক আইন না জেনে কিংবা গাড়ির মৌলিক যান্ত্রিক নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা না থাকা অবস্থায় কাউকে যাত্রীবাহী যান চালানোর অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।
বিশেষ করে ব্রেক, লাইট, স্টিয়ারিং, টায়ার ও ব্যাটারির নিরাপত্তা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ সস্তা বা নিম্নমানের ব্যাটারি শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকি নয়, পরিবেশগত সমস্যাও তৈরি করতে পারে।
প্রযুক্তি হতে পারে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার
সরকারের প্রস্তাবিত ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও কিউআর কোড ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। তবে প্রযুক্তি বসালেই হবে না; তথ্যকে বাস্তবে ব্যবহার করতে হবে।
প্রতিটি অনুমোদিত অটোরিকশার একটি ইউনিক পরিচয় থাকবে। সেটি কোন রুটে চলবে, কার নামে নিবন্ধিত, চালক কে—এসব তথ্য ডিজিটাল ডাটাবেজে থাকতে পারে।
একই নম্বরে একাধিক গাড়ি চললে তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—এটি ‘চেনাজানা’ বা মৌখিক অনুমতির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
তবে কঠোরতার সঙ্গে মানবিকতাও দরকার
এখানে একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। অটোরিকশা খাতে যারা ইতোমধ্যে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের একদিনে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া সমাধান নয়।
নতুন নিয়ম চালুর আগে সময়সীমা দেওয়া যেতে পারে। পুরোনো যান পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে নিরাপদ যান দিয়ে প্রতিস্থাপনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। দরিদ্র চালকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও বিবেচনায় আসতে পারে।
কারণ রাষ্ট্র যদি বলে, ‘তোমার গাড়ি অবৈধ, এখন চলে যাও’, তাহলে সমস্যাটি রাস্তা থেকে সরবে না; সমস্যাটি চলে যাবে একটি পরিবারের রান্নাঘরে।
শেষ কথা
অটোরিকশা শহরের শত্রু নয়। কিন্তু অপরিকল্পিত অটোরিকশা নগরের শত্রু হয়ে উঠতে পারে।
একটি শহরের রাস্তা সীমিত। সেই সীমিত জায়গায় অসীমসংখ্যক যান নামিয়ে দিয়ে যানজটমুক্ত শহরের স্বপ্ন দেখা আত্মপ্রবঞ্চনা।
তাই কুষ্টিয়াসহ দেশের জেলা শহরগুলোর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে আলাদা পরিবহন পরিকল্পনা। কোথায় অটোরিকশা চলবে, কোথায় চলবে না, কতগুলো চলবে, কোথায় দাঁড়াবে—সবকিছুর স্পষ্ট মানচিত্র দরকার।
একই সঙ্গে প্রয়োজন নিয়মিত অভিযান। কারণ আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা আইন না থাকা নয়; আইন থাকার পরও তা প্রয়োগ না করা।
আজ অটোরিকশা পঙ্গপালের মতো শহরের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে—এমন অভিযোগ অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু পঙ্গপাল তাড়ানোর মতো করে মানুষকে তাড়িয়ে দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে অটোরিকশা থাকবে, চালকের জীবিকাও থাকবে, যাত্রীর সাশ্রয়ী পরিবহনও থাকবে—কিন্তু শহরের রাস্তা আর অচল হয়ে থাকবে না।
কারণ শহর শুধু গাড়ির চলাচলের জন্য নয়। শহর মানুষের জন্য। আর মানুষের শহরকে মানুষের চলাচলের উপযোগী রাখতল নগর ব্যবস্থাপনার প্রথম দায়িত্ব।
ড.আমানুর আমান, সম্পাদক প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া, দি কুষ্টিয়া টাইমস

Explore More Districts