আবুল হাসান ফায়জ: হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় হঠাৎ করেই আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে তিন নারী ও এক পুরুষসহ চারজনের আত্মহত্যার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন সংকটকে এসব ঘটনার সম্ভাব্য পটভূমি হিসেবে উল্লেখ করছেন স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
সর্বশেষ গত ১৫ জুলাই উপজেলার হাড়িয়া গ্রামের একটি ভাড়া বাসা থেকে আনিতা বেগম (১৯) নামে এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত আনিতা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। তাঁর স্বামী বুলবুল আহমদ স্থানীয় একটি কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কর্মরত।
পুলিশ জানায়, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক কলহের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে গত ৬ জুলাই নোয়াপাড়া চা বাগানের চা-শ্রমিক প্রকাশ রেলী (২৬) আত্মহত্যা করেন। পরিবারের দাবি, সুদখোর মহাজনের ঋণের চাপ ও মানসিক দুশ্চিন্তা সহ্য করতে না পেরে তিনি এ পথ বেছে নেন।
এরও দুই দিন আগে, গত ৪ জুলাই জগদীশপুর চা বাগানের শ্রমিক সবিতা বাউরী (৩০) আত্মহত্যা করেন। তবে তাঁর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পরিবারের সদস্যরা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। একই দিনে উপজেলার খাটুরা গ্রামের সুমা সরকার (২০) নামের আরও এক তরুণীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।
স্বল্প সময়ে একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনায় মাধবপুরের সাধারণ মানুষের মধ্যে মানসিক ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রেম বা দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক কলহ, ঋণের চাপ, বেকারত্ব, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, একাকীত্ব এবং স্থানীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ মানুষকে চরম হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বিজয় কুমার দত্ত বলেন, “আত্মহত্যা সাধারণত কোনো একক কারণে ঘটে না। মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা চাপ একসঙ্গে কাজ করে একজন মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। তাই প্রতিটি ঘটনাকে সংবেদনশীলভাবে দেখতে হবে এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।”
তিনি আরও বলেন, “পরিবারের কেউ দীর্ঘদিন বিষণ্নতায় ভুগলে, অতিরিক্ত হতাশা প্রকাশ করলে বা নিজেকে গুটিয়ে নিলে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং পরিবারের সমর্থন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
মাধবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাহেল রানা জানান, প্রতিটি ঘটনার আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি আত্মহত্যার মতো সামাজিক সমস্যা প্রতিরোধে সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় সামান্য ভুল বোঝাবুঝি বা আবেগের বশে মানুষ এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তাই পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক মূল্যবোধ আরও জোরদার করতে হবে। পুলিশ যেকোনো সংকটকালীন পরিস্থিতিতে সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।”

