সমুদ্রের তীব্র ভাঙনে লণ্ডভণ্ড কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

সমুদ্রের তীব্র ভাঙনে লণ্ডভণ্ড কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

১০ July ২০২৬ Friday ৯:৪৮:০১ PM

Print this E-mail this


কলাপাড়া ((পটুয়াখালী) প্রতিনিধি :

সমুদ্রের তীব্র ভাঙনে লণ্ডভণ্ড কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

পটুয়াখালীর সাগরকন্যা কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধীরে ধীরে বিলীন হওয়ার পথে। সমুদ্রের তীব্র ভাঙনে সৈকতসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন দর্শনীয় স্থান। কোথাও সৈকতের বালু ধুয়ে নিচু, আবার কোথাও উঁচু হয়ে গেছে। পুরো সৈকতজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে জীর্ণশীর্ণ জিও টিউব ও জিও ব্যাগ। বর্ষা মৌসুমে উত্তাল ঢেউয়ের তাণ্ডবে প্রতি বছরই শ্রীহীন হয়ে পড়ছে কুয়াকাটা। অথচ সৈকত রক্ষায় এখনো দৃশ্যমান কোনো টেকসই উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০০০ সাল থেকে কুয়াকাটা সৈকতে ভাঙন শুরু হয়। ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। ২০১১ সালের পর ভাঙনের তীব্রতা কিছুটা কমলেও প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নতুন করে ভাঙন দেখা দেয়। চলতি বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে সৈকতের পশ্চিম মাঝিবাড়ি এলাকায় কয়েকটি কংক্রিট ব্লক সরে গেছে। এছাড়া ঝাউবন, গঙ্গামতি ও চর গঙ্গামতিসহ প্রায় ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকা ভাঙনের কবলে পড়েছে। অনেক স্থানে বালু সরে গিয়ে গাছের শেকড় উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদে এভাবে সৈকতের নান্দনিকতা নষ্ট হলে পর্যটকের সংখ্যা কমে যাবে। এতে ক্ষতির মুখে পড়বে পর্যটননির্ভর স্থানীয় অর্থনীতি। তারা সৈকতের বালু ক্ষয় রোধে দ্রুত টেকসই গ্রোয়েন বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছরের ভাঙনে ইতোমধ্যে ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগান, শালবন, এলজিইডির বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, ডাকবাংলো, বিস্তীর্ণ ঝাউবন, ইকোপার্কসহ বহু স্থাপনা সাগরে বিলীন হয়েছে। গত বছর ভেঙে গেছে নির্মাণাধীন মেরিন ড্রাইভ সড়কের একটি অংশ। বর্তমানে ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্স, মসজিদ, মন্দির, ট্যুরিজম পার্ক, ওয়াশরুমসহ বিভিন্ন স্থাপনা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। জোয়ারের সময় সৈকতের ওয়াকওয়েও পানির নিচে তলিয়ে যায়।
পর্যটকদের অভিযোগ, একসময় যেখানে বিস্তীর্ণ বালুকাবেলায় হাঁটাহাঁটি করে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করা যেত, সেখানে এখন চোখে পড়ে জিও ব্যাগের স্তূপ। এতে কুয়াকাটা সৈকতের সৌন্দর্য ও আকর্ষণ অনেকটাই কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিও ব্যাগ সাময়িকভাবে ভাঙন রোধে কিছুটা কার্যকর হলেও কুয়াকাটাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক উপকূল ব্যবস্থাপনা। এজন্য নিয়মিত ড্রেজিং, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ এবং উপকূলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল মোতালেব শরীফ বলেন, “কুয়াকাটার সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন সমুদ্রভাঙন। সৈকত ও পর্যটন রক্ষায় স্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।”
কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন আনু বলেন, “সৈকতের বালু ক্ষয় রোধে সময়োপযোগী স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একসময় হারিয়ে যাবে। ভুল নকশা ও পরিকল্পনার কারণে বারবার প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এ ক্ষেত্রে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বহীনতা রয়েছে।”
এ বিষয়ে কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, “ভাঙন রোধে সৈকতে অস্থায়ীভাবে বালুভর্তি জিও টিউব স্থাপন করা হয়েছে এবং কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলে স্থায়ীভাবে ভাঙন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

Explore More Districts