নগরে গতকাল মঙ্গলবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। একদিনে এত পরিমাণ বৃষ্টি গত ৪২ বছরে রেকর্ড করেনি আবহাওয়া অফিস। অর্থাৎ গতকাল রেকর্ড বৃষ্টি হয়েছে। রেকর্ড বৃষ্টির এদিনে জলাবদ্ধতা ও পাহাড় ধসে প্রাণহানিসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যয় নেমে আসে জনজীবনে।
এদিন নগরের বিভিন্ন স্থানে গাছ পড়ে ছিঁড়ে যায় বৈদ্যুতিক তার এবং কয়েক স্থানে ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ায় বিঘ্নিত হয় বিদ্যুৎ সেবা। রেললাইন ডুবে যাওয়ায় চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটে আটকা পড়ে ট্রেন। বন্ধ হয়ে যায় ট্রেন চলাচল। এতে ভোগান্তি হয় যাত্রীদের। সমুদ্র উত্তাল থাকায় এর প্রভাবে ব্যাহত হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমও। এছাড়া শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এদিন তিনটি ফ্লাইট নামতে পারেনি। ভেঙে পড়ে পতেঙ্গা এলাকায় একটি বাইপাস সড়কের একাংশ।
সব মিলিয়ে গতকাল ‘দুর্বিষহ’ একটি দিন পার করেছেন নগরবাসী। বিশেষ করে জলাবদ্ধতার কারণে জনদুর্ভোগ ছিল বেশি। সকালে কর্মস্থলমুখী লোকজন, স্কুল–কলেজগামী শিক্ষার্থী, জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষ ও শ্রমজীবী মানুষের সীমাহীন ভোগান্তি হয়েছে। রেয়াজউদ্দীন বাজারের বিভিন্ন দোকানপাটে পানি ঢুকে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া বৃষ্টির অজুহাতে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে দিনভর।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চলছে ১৪ হাজার কোটি টাকার চারটি প্রকল্পের কাজ। প্রকল্পগুলোর কাজও শেষ পর্যায়ে। এরপরও জলাবদ্ধতা হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। অবশ্য প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, গত তিন দিনে রেকর্ড ৫৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা অপ্রত্যাশিত। এতে অনেক জায়গায় পানি জমে যায়। তবে বৃষ্টি থেমে গেলে এক থেকে দেড় ঘণ্টার ভিতরে পানি নেমে যায় বলে দাবি করেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া গতকাল ভারী বৃষ্টির সময় ছিল জোয়ার, যা জলাবদ্ধতার তীব্রতা বৃদ্ধি করে।
৪২ বছরে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত : আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট নগরে ২৪ ঘণ্টায় ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। এরপর গতকাল ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড হয় ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি। অর্র্থৎ গতকাল রেকর্ড হওয়া বৃষ্টি গত ৪২ বছরে সর্বোচ্চ। মাঝখানে অবশ্য ২০০৭ সালের ১১ জুন ৪০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়।
এদিকে ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে রেকর্ড হয় ৪০৭ মিলিমিটার বৃষ্টি। ওই হিসেবে গতকাল ৪৩ বছরের মধ্যে জুলাই মাসে রেকর্ড হওয়া সর্বোচ্চ বৃষ্টি। এ বিষয়ে আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামে ৪০৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। তারপর আজই (গতকাল) চট্টগ্রামে জুলাই মাসে এত বৃষ্টি হলো।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৩৯৪ দশমিক ৩ মিলিমিটার ও রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৩৬৪ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। এছাড়া গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ৩ ঘণ্টায় রেকর্ড হয় ৩০ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত।
জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ : সোমবার দিবাগত মধ্যরাত থেকে শুরু হয় ভারী বৃষ্টি। মাঝখানে একটু কমলেও গতকাল সকাল থেকে আবারও অতি ভারী বৃষ্টি হয়। এদিকে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে জোয়ার শুরু হয়। ফলে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি একীভূত হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় নগরে। এদিন নগরের অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়েছে, যেখানে এর আগে হয়নি। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বৃষ্টির পরিমাণ কমে আসে। এর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে বেশ কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা কমে এলেও অনেক এলাকায় পানি নামেনি।
সকাল থেকে সরেজমিনে গিয়ে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যায় শহরের অনেক এলাকা। পানি ঢুকে যায় বাসা–বাড়ি ও দোকানপাটে। হালিশহর, পতেঙ্গা, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, কাস্টম হাউজ প্রাঙ্গণ, কাঠগড় মুসলিমাবাদ এলাকা, আগ্রাবাদের বেপারিপাড়া, মুহুরীপাড়া, কাঁচাবাজার ও মৌলভী পাড়া এলাকা, মুরাদপুর, সিঅ্যান্ডবি, কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা, চকবাজার, কাপাসগোলা, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, জামালখান বাই লেন, রহমতগঞ্জ ও ষোলশহরসহ বিভিন্ন জায়গায় জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ ছিল বেশি। পানি জমে যায় পোর্ট কানেক্টিং রোডের হালিশহর আবাসিক থেকে নয়া বাজার পর্যন্ত অংশে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দুপুর সাড়ে ১২টার পর থেকে পানি বাড়তে থাকে মুরাদপুর–বহদ্দারহাট সড়কের মোহাম্মদপুর অংশে। হাঁটুর বেশি পানি হয়েছে সেখানে। অবশ্য বৃষ্টি থামার পর পানি নেমে যায়। এদিকে পানি ঢুকে গেছে কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকার বেশ কিছু বাসাবাড়ির নিচতলায়। জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান মেগা প্রকল্পভুক্ত হিজড়া খালের কাজ শেষ না হওয়ায় জলাবদ্ধতা হয়েছে ওই এলাকায়।
কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা রহিম আজাদীকে বলেন, খুব কষ্টে আছি, জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে কবে মুক্তি পাব জানি না।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাশেম আজাদীকে বলেন, সিঅ্যান্ডবি থেকে চেরাগী পাহাড় কর্মস্থলে আসতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। সিঅ্যান্ডবি থেকে বাস টার্মিনাল পর্যন্ত পানি ছিল প্রায় কোমর সমান। পরে বহদ্দারহাট এসে আন্দরকিল্লামুখী গাড়িতে উঠি। পানির জন্য গাড়ি চকবাজার দিয়ে না এসে শাহ আমানতমুখী সড়ক হয়ে বাকলিয়া এঙেস রোড হয়ে আন্দরকিল্লা আসি। এতে দুর্ভোগের পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়াও গুণতে হয়।
একই কথা বলেন চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা থেকে আন্দরকিল্লা আসা মো. সেলিম।
এদিকে রেয়াজউদ্দীন বাজারের বিভিন্ন দোকানপাটেও পানি ঢুকে গেছে। এতে কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্য নষ্ট হয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া পানি ঢুকে যাওয়ায় ব্যাহত হয় বেচাকেনাও।
রেয়াজউদ্দীন বাজারের একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের কর্মচারী ফারুক আজাদীকে বলেন, দোকানে পানি ঢুকে গেছে। আজকের মতো ক্ষয়ক্ষতি গত কয়েক বছরেও হয়নি। মার্কেটের প্রতিটি দোকানে পানি ঢুকে ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ গুণে শেষ করা যাবে না।
এদিকে কোমর সমান পানি জমে যায় হাটহাজারী–অঙিজেন রোডের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড়দিঘির পাড় এলাকায়। এতে ব্যাহত হয় যান চলাচল।
সড়কে গাছ : গতকাল নগরের বিভিন্ন জায়গায় গাছ ভেঙে আছড়ে পড়ে সড়কে। এতে ব্যাহত হয় যান চলাচল। এছাড়া গাছের ডাল পড়ে ছিঁড়ে যায় বৈদ্যুতিক তার। টাইগারপাস, উত্তর কাট্টলী ও আসকারদিঘি পাড়ে সড়কে গাছ ভেঙে পড়ার খবর পাওয়া যায়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গাছ ভেঙে পড়ায় যান চলাচলে সাময়িক বাধাগ্রস্ত হয়।
নামতে পারেনি ফ্লাইট : চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে গতকাল তিনটি ফ্লাইট নামতে পারেনি। এছাড়া তীব্র বাতাসের কারণে বিলম্বিত হয় বেশ কিছু ফ্লাইটের উড্ডয়ন ও অবতরণ।
বৃষ্টি হতে পারে আজও : আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে গতকাল দুপুর ৩টা থেকে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ৩টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতাসহ চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমি ধস হতে পারে। এদিকে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত ও চট্টগ্রাম নদী বন্দরের জন্য ২ নম্বর নৌ সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।


