ড্রপআউট’ শিক্ষাজীবন নিয়েও জগদ্বিখ্যাত যারা

ড্রপআউট’ শিক্ষাজীবন নিয়েও জগদ্বিখ্যাত যারা

মানুষের সাফল্য মাপার সবচেয়ে প্রচলিত মানদণ্ডগুলোর একটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। সমাজে এখনো এমন ধারণা প্রবল যে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, উজ্জ্বল একাডেমিক ফলাফল এবং একটি সম্পূর্ণ ডিগ্রিই জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যের চাবিকাঠি। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাস্তবতা এতটা একরৈখিক নয়।

পৃথিবীর বহু প্রভাবশালী মানুষ আছেন, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি শেষ করতে পারেননি, কেউ মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়েছেন, কেউ বা কখনো উচ্চশিক্ষার সুযোগই পাননি। অথচ তারাই রাজনীতি, প্রযুক্তি, সাহিত্য, ব্যবসা, শিল্প কিংবা বিজ্ঞানের ইতিহাস বদলে দিয়েছেন। এ মানুষদের গল্প কেবল ‘ড্রপআউট সফলতা’র গল্প নয়; বরং এটি মানুষের কৌতূহল, আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা ও আত্মশিক্ষার শক্তির গল্প।

প্রযুক্তির বিপ্লব: বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যারা বদলে দিয়েছেন পৃথিবী

বিশ্ব প্রযুক্তির ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে অন্যতম স্টিভ জবস। তরুণ বয়সে তিনি কলেজে ভর্তি হলেও কয়েক মাস পরই পড়াশোনা ছেড়ে দেন। কারণ ছিল অর্থনৈতিক চাপ ও নিজের আগ্রহের সঙ্গে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার অসামঞ্জস্য। কিন্তু সেই মানুষটিই পরে অ্যাপল প্রতিষ্ঠা করে ব্যক্তিগত কম্পিউটার, স্মার্টফোন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির জগতে এক বিপ্লব ঘটান। আজকের স্মার্টফোন সংস্কৃতি, ডিজিটাল ডিজাইন কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি ভাবনার পেছনে স্টিভ জবসের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না।

একইভাবে বিল গেটসও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও মাঝপথে বেরিয়ে আসেন। তার মনোযোগ ছিল সফটওয়্যার উন্নয়নের দিকে। পরবর্তীতে তিনি মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠা করেন এবং ব্যক্তিগত কম্পিউটারকে সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন।

মার্ক জাকারবার্গের গল্পও প্রায় একইরকম। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীনই তিনি ২০০৪ সালে ফেসবুক তৈরি করেন। পরে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই পুরোপুরি প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরু করেন। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনযাত্রা, রাজনীতি, ব্যবসা এবং সংস্কৃতিকে যেভাবে প্রভাবিত করছে, তার বড় অংশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নাম।

রিচার্ড ব্র্যানসন তো আরও কম বয়সে স্কুল ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার উদ্যোক্তা মানসিকতা তাকে গড়ে তোলে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ব্যবসায়ী হিসেবে। ভার্জিন গ্রুপের মাধ্যমে তিনি বিমান, সংগীত, মহাকাশসহ নানা খাতে ব্যবসা বিস্তার করেন।

রাজনীতি: ডিগ্রি ছাড়াও নেতৃত্বের ইতিহাস

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন বহু রাজনৈতিক নেতা আছেন যাদের শিক্ষাজীবন ছিল অসম্পূর্ণ, অস্থির কিংবা প্রচলিত মানদণ্ডে ‘সফল’ নয়। কেউ আর্থিক সংকটে পড়াশোনা ছেড়েছেন, কেউ আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িয়ে গেছেন, আবার কেউ বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বড় শিক্ষা হিসেবে নিয়েছেন। তবু তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, যুদ্ধের সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন, বিপ্লব ঘটিয়েছেন এবং কোটি মানুষের ইতিহাস বদলে দিয়েছেন।

আব্রাহাম লিংকনের নাম এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি। স্বশিক্ষিত এই মানুষটি বই পড়ে, নিজের চেষ্টায় আইন শিখে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্টে পরিণত হন। দাসপ্রথা বিলোপ ও আমেরিকার জাতীয় ঐক্য রক্ষায় তার ভূমিকা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

উইনস্টন চার্চিলও প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার ধারায় ছিলেন না। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তার নেতৃত্ব, ভাষণ ও দৃঢ়তা ব্রিটেনকে কঠিন সময় পার করতে সাহায্য করে।

দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার শিক্ষাজীবনও রাজনৈতিক সংগ্রামের কারণে বারবার ব্যাহত হয়। ১৯৩৯ সালে ম্যান্ডেলা ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ভর্তি হন। ছাত্র আন্দোলনে জড়িত থাকায় তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। দীর্ঘ ২৭ বছরের কারাবাস ম্যান্ডেলার জীবনকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং তিনি বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের বিশ্ব প্রতীকে পরিণত হন।

শিল্প ও সংস্কৃতি: সৃজনশীলতায় কোনো সনদ লাগে না

সৃজনশীল জগতেও ডিগ্রির চেয়ে প্রতিভা ও অভিজ্ঞতা অনেক সময় বড় হয়ে উঠেছে।

চার্লি চ্যাপলিন দারিদ্র্যের কারণে খুব অল্প বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। কিন্তু নির্বাক চলচ্চিত্রে তার অভিনয়, হাস্যরস ও মানবিকতা তাকে চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিল্পীদের একজন বানিয়েছে।

জিমি হেন্ডরিক্স স্কুল শেষ করতে পারেননি। কিন্তু গিটারের প্রতি অসাধারণ দক্ষতা তাকে রক সংগীতের কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে। আধুনিক গিটারবাদনের ভাষা বদলে দেওয়ার কৃতিত্ব অনেকাংশেই তার।

এছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্রের উদাহরণ তো আছেই। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের উচ্চশিক্ষা ছিল না। কিন্তু দ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও মানবতার কবি হিসেবে তিনি বাংলা সাহিত্যকে নতুন ভাষা দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী ছিলেন না, তবু তিনি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেন এবং সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।

বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন: আত্মশিক্ষার অসাধারণ শক্তি

অনেকেই মনে করেন বিজ্ঞান মানেই দীর্ঘ একাডেমিক জীবন। কিন্তু ইতিহাসে এমন কিছু বিজ্ঞানী আছেন যাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল খুব সীমিত।

টমাস আলভা এডিসন ছোটবেলায় খুব অল্প সময় স্কুলে পড়েছিলেন। তার মা বাসায় তাকে পড়াতেন। পরবর্তীতে তিনি হাজারের বেশি আবিষ্কারের ‘পেটেন্ট’ নেন এবং বৈদ্যুতিক বাতি থেকে শুরু করে শব্দ রেকর্ডিং প্রযুক্তি—নানা ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন।

মাইকেল ফ্যারাডে ছিলেন দরিদ্র পরিবারের সন্তান। বই বাঁধাইয়ের দোকানে কাজ করতে করতেই বিজ্ঞানের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি ছাড়াই তিনি তড়িৎচুম্বকত্বের ভিত্তি গড়ে তোলেন, যার ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক বিদ্যুৎ প্রযুক্তি বিকশিত হয়েছে।

এসব উদাহরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়— ডিগ্রি মানুষের সম্ভাবনার একমাত্র মাপকাঠি নয়। সারা বিশ্বের ইতিহাস জুড়ে এমন অসংখ্য উদাহরণ ছড়িয়ে আছে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা বা অসমাপ্ত শিক্ষাজীবন কখনোই সফলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং নিজের প্রতিভা, কৌতূহল, আত্মশিক্ষা, অধ্যবসায়, সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাসের শক্তিতে এসব মানুষ প্রথাগত শিক্ষার সীমা অতিক্রম করে মানব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছেন এবং চিরস্থায়ীভাবে নিজেদের নাম ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছেন।

এসএম সোহানুর রহমান

১৪ মে ২০২৬

এ জি

Explore More Districts