ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, রামমোহন রংপুরে তাঁর বাসভবনে নিয়মিত সভার আয়োজন করতেন, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শন নিয়ে আলোচনা হতো। তিনি লিখেছেন:
‘এই সভা করিয়া তিনি প্রকাশ্যভাবে স্বীয় ধর্ম্মমত প্রচার করিতে আরম্ভ করেন। রংপুরে অবস্থানকালে সুপ্রসিদ্ধ তান্ত্রিক হরিহরানন্দ তীর্থস্বামী কুলাবধূত তাঁহার সহিত মিলিত হন। রামমোহনের সভায় অনেক জৈন মহাজনও উপস্থিত থাকিতেন। “আত্মীয় সভা”র ইহাই সূত্রপাত বলা যাইতে পারে।’
এই উদ্ধৃতি রামমোহনের রংপুর পর্বের গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখান থেকে তাঁর কর্মের কয়েকটি প্রধান দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
১. প্রকাশ্যে ধর্মমত প্রচার
রংপুরের সভা ছিল তাঁর ধর্মমত প্রচারের প্রথম প্রকাশ্য মঞ্চ। এর আগে তিনি ব্যক্তিগত স্তরে বা লেখনীর মাধ্যমে তাঁর একেশ্বরবাদী ও পৌত্তলিকতাবিরোধী মত প্রকাশ করলেও, নিয়মিত আলোচনাচক্রের মাধ্যমে এখানেই প্রথম তা প্রচারের উদ্যোগ নেন। এটি ছিল তাঁর চিন্তাকে ব্যক্তিগত স্তর থেকে সামাজিক স্তরে নিয়ে যাওয়ার এক দুঃসাহসিক পদক্ষেপ। সভাগুলোতে তিনি হিন্দুশাস্ত্র, বিশেষত বেদ ও উপনিষদের ভিত্তিতে একেশ্বরবাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন এবং প্রচলিত মূর্তিপূজা ও আচারসর্বস্ব ধর্মের অসারতা তুলে ধরতেন।
২. আন্তধর্মীয় সংলাপের সূচনা
রামমোহনের সভায় কেবল হিন্দু পণ্ডিতরাই নন, জৈন বণিকদেরও উপস্থিতি ছিল বলে জানা যায়। এটি প্রমাণ করে যে তাঁর আলোচনা কেবল হিন্দুধর্মের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল এক আন্তধর্মীয় সংলাপের ক্ষেত্র। তিনি বিভিন্ন ধর্মের তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে একটি সর্বজনীন সত্যে উপনীত হতে চেয়েছিলেন। ইসলাম ও খ্রিষ্টধর্মের একেশ্বরবাদের সঙ্গে হিন্দু বেদান্তের অদ্বৈতবাদের যে সাদৃশ্য তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন, সেই সমন্বয়বাদী দর্শনের ব্যবহারিক প্রয়োগ শুরু হয় রংপুরের এই সভাগুলোতেই। এই প্রচেষ্টা তাঁর ভবিষ্যৎ ‘ব্রাহ্মসমাজ’ প্রতিষ্ঠার ভাবনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
৩. ‘আত্মীয় সভা’র পূর্বপ্রস্তুতি
ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত সঠিকভাবেই রংপুরের এই সমাবেশকে কলকাতার বিখ্যাত ‘আত্মীয় সভা’র (প্রতিষ্ঠা ১৮১৫) ‘সূত্রপাত’ বা ভ্রূণ বলে চিহ্নিত করেছেন। ‘আত্মীয় সভা’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রামমোহন কলকাতায় যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তার কাঠামো, উদ্দেশ্য এবং কার্যপ্রণালির মহড়া সম্পন্ন হয়েছিল রংপুরের এই ছোট পরিসরে। রংপুরের সাফল্যই তাঁকে কলকাতায় বৃহত্তর ও আরও সংগঠিত উদ্যোগ গ্রহণে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল। এই সভাগুলো ছিল তাঁর সামাজিক নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতার প্রথম পরীক্ষাক্ষেত্র।
হরিহরানন্দ তীর্থস্বামীর সঙ্গ
রংপুরে রামমোহনের দার্শনিক চিন্তার বিকাশে যাঁর প্রভাব ছিল সর্বাধিক, তিনি হলেন সুপ্রসিদ্ধ তান্ত্রিক পণ্ডিত হরিহরানন্দ তীর্থস্বামী কুলাবধূত। হরিহরানন্দ ছিলেন এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব; প্রচলিত মত অনুযায়ী, তিনি রামমোহনের বাবার বন্ধু ছিলেন এবং রামমোহনের বাল্যকাল থেকেই তাঁর ওপর হরিহরানন্দের স্নেহ ও প্রভাব ছিল। রংপুরে অবস্থানকালে এই দুই মনস্বীর সাক্ষাৎ তাঁদের পারস্পরিক জ্ঞানচর্চাকে এক নতুন মাত্রা দান করে।
তাঁদের সম্পর্ক গুরু-শিষ্যের গতানুগতিক ধারার ছিল না, বরং তা ছিল দুই সমধর্মী জ্ঞানান্বেষীর মধ্যে এক গভীর বৌদ্ধিক আদান-প্রদান। হরিহরানন্দ যদিও ছিলেন তান্ত্রিক সাধক, তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল বিশাল এবং তিনি রামমোহনের একেশ্বরবাদী চিন্তার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তাঁদের মধ্যে নিয়মিত শাস্ত্রালোচনা হতো। রামমোহন তাঁর কাছ থেকে তন্ত্রশাস্ত্রের নিগূঢ় রহস্য এবং বেদান্তের জটিল তত্ত্ব সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করেন। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন যে রামমোহন রংপুরে ‘হিন্দুশাস্ত্র ও দর্শনালোচনা চর্চা করেন।’এই চর্চায় হরিহরানন্দের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

