বিশেষ প্রতিনিধি: ভোরের আলো যখন নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকার মেহগনি আর কৃষ্ণচূড়ার ডাল বেয়ে পিচঢালা পথে নেমে আসে, তখন চারপাশ ঘিরে ধরে এক আশ্চর্য নিস্তব্ধতা। যে নিস্তব্ধতা নাগরিক কোলাহলের বিপরীতে এক অপার্থিব শান্তির বারতা দেয়। অথচ আজ থেকে মাত্র ৩৬৫ দিন আগে এই ভোরের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কর্কশ ইলেকট্রনিক হর্নের আর্তনাদ, বেপরোয়া অটোরিকশার চাকার ঘর্ষণ আর অসহনীয় যানজটের জাঁতাকলে পিষ্ট এক জনপদ ছিল এই নিকুঞ্জ ও খিলক্ষেত টানপাড়া। আজ ৩০ এপ্রিল, ২০২৬। ঠিক এক বছর আগে এই এলাকার মানুষ এক অবিশ্বাস্য শপথ নিয়েছিল—তারা তাদের হারানো প্রশান্তি ছিনিয়ে আনবে। আজ সেই জনজাগরণের এক বছর পূর্তিতে নিকুঞ্জ কেবল একটি এলাকা নয়, বরং নাগরিক অধিকার আদায়ের এক জীবন্ত মহাকাব্যে পরিণত হয়েছে।

ঢাকার এই ঘিঞ্জি শহরের ভেতরে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার মতো জায়গার বড় অভাব। তার ওপর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত দৌরাত্ম্য আবাসিক এলাকাগুলোকে নরক গুলজারে পরিণত করেছিল। অদক্ষ চালক, যত্রতত্র পার্কিং আর সড়কের অব্যবস্থা কেড়ে নিয়েছিল শিশুদের শৈশব। মায়েরা সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে জানালার গ্রিল ধরে উদ্বেগে প্রহর গুনতেন। প্রবীণরা ঘর থেকে বের হতে ভয় পেতেন। প্রতিটি পরিবার যেন এক অদৃশ্য কারাগারের বাসিন্দা হয়ে পড়েছিল। কিন্তু পরিবর্তন তো হুট করে আসে না; পরিবর্তন আসে বোধ থেকে, জেগে ওঠা থেকে। নিকুঞ্জবাসী বুঝতে পেরেছিলেন, বাইরের কোনো ঐশ্বরিক শক্তি এসে তাদের সমস্যার সমাধান করবে না। নিজেদের আঙিনা নিজেদেরই পরিষ্কার করতে হবে। সেই গভীর উপলব্ধি থেকেই শুরু হয়েছিল এক স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ—নাগরিক বিদ্রোহ।

এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কারিগর কোনো বড় রাজনৈতিক দল নয়, কোনো বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী নেতাও নয়। এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন সাধারণ গৃহিণী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, তরুণ শিক্ষার্থী আর ছোট উদ্যোক্তারা। কোনো রাজনৈতিক রং বা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে তারা কেবল একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য এক হয়েছিলেন। স্থানীয় কল্যাণ সমিতি থেকে শুরু করে এলাকার ক্লাব, সংগঠন আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো একে একে এই আন্দোলনের সুতোয় বাঁধা পড়ে। ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল যখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, তখন সারা দেশের মানুষ বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেছিল—একটি আবাসিক এলাকা কীভাবে সকল রক্তচক্ষু ও স্বার্থান্বেষী মহলের বাধা উপেক্ষা করে অটোরিকশা মুক্ত হতে পারে। অসাধ্য সাধন করার সেই মন্ত্র ছিল সর্বস্তরের এলাকাবাসীর ‘ইস্পাত কঠিন জনঐক্য’।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পেছনে পর্দার আড়ালে থেকে সমন্বয়কের গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল। ৩৫ বছরের দীর্ঘ পেশাগত জীবনে অনেক রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্থান-পতন দেখলেও, নিজের এলাকার এই শান্তিকামী বিপ্লব তাঁকে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে। তবে সাফল্যের এই আলোকচ্ছটায় তিনি নিজেকে সযত্নে আড়ালে রেখেছেন। নিজেকে এই আন্দোলনের সবচেয়ে ক্ষুদ্র একজন উদ্যোক্তা দাবি করে তিনি বলেন, ”আমি নিজেকে এই আন্দোলনের সবচেয়ে ক্ষুদ্র একজন উদ্যোক্তা মনে করি। প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো ব্যক্তির জয় নয়, বরং এটি আমাদের প্রাণপ্রিয় এলাকাবাসীর সম্মিলিত সংকল্পের বিজয়। যারা ভয় না পেয়ে গত বছরের এই দিনে রাস্তায় নেমেছিলেন, যারা নিজেদের সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য এক হয়েছিলেন, বিজয়টা একান্তই তাঁদের। আমি কেবল একজন সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র; আমাদের আসল শক্তি ছিল সর্বস্তরের মানুষের হার না মানা মনোভাব। আজ যখন দেখি আমাদের এলাকার এই মডেলে সারা দেশ আশার আলো দেখছে, তখন মনে হয়—সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষ এক হলে পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে আটকাতে পারে না।”
এক বছরের এই শান্তিময় পথচলার সুফল আজ প্রতিটি ঘরে ঘরে অনুভূত হচ্ছে। নিকুঞ্জ ও টানপাড়ার প্রকৃতি যেন এক বছর পর তার পুরনো রূপ ফিরে পেয়েছে। শব্দদূষণের সেই ভয়াবহ স্মৃতি এখন ধূসর ইতিহাস। আগে যেখানে মিনিটে গড়ে অসংখ্যবার কর্কশ হর্নের শব্দে কান ঝালাপালা হতো, এখন সেখানে ভোরের পাখির ডাক শোনা যায় স্পষ্ট। স্কুলগামী শিশুদের মুখে এখন ভয়ের ছায়া নেই, আছে এক বুক প্রশান্তির হাসি। অভিভাবকরা এখন নিশ্চিন্তে সন্তানদের স্কুল বা পার্কে পাঠান। বিকেলে শিশুদের সাইকেল চালানোর সেই হারানো দৃশ্য আবার ফিরে এসেছে নিকুঞ্জের প্রশস্ত সড়কে। প্রবীণরা এখন লাঠিতে ভর দিয়ে নির্ভয়ে প্রাতঃভ্রমণ করেন, পরিচিতদের সাথে পথের ধারে আড্ডায় মাতেন। এই মানবিক পরিবর্তনগুলো কোনো উন্নয়ন সূচকে পরিমাপ করা সম্ভব নয়, এগুলো কেবল হৃদয়ে অনুভব করা যায়।
সারা বাংলাদেশে যখন অটোরিকশা বন্ধ করা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় চলছে, যখন প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে একটি সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, তখন নিকুঞ্জ ও খিলক্ষেত টানপাড়া বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক সফল মডেল হিসেবে। দেশের বড় বড় ভিআইপি এলাকা যা করতে ব্যর্থ হয়েছে, এই এলাকার বাসিন্দারা তা করে দেখিয়েছেন কেবল নিজেদের একতার জোরে। এটি আজ সমগ্র বাংলাদেশের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। নিকুঞ্জবাসী দেখিয়ে দিয়েছেন যে, জনঐক্য এক হলে সব কিছুই অর্থাৎ অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। পরিবর্তনের পেছনে আসলে প্রয়োজন হয় একটি সাহসী সিদ্ধান্ত আর কিছু জেগে ওঠা মানুষ। নিকুঞ্জ আজ তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
অবশ্য এই এক বছরের পথচলা সবসময় পুষ্পশয্যা ছিল না। কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল, পরিবহন সিন্ডিকেট আর নানা মহলের চাপ ছিল প্রতিনিয়ত। যাতায়াত ব্যবস্থার সাময়িক সংকটকে পুঁজি করে আন্দোলন নস্যাৎ করার চেষ্টাও কম হয়নি। কিন্তু এলাকাবাসীর সংকল্প ছিল পাহাড়ের মতো অটল। তারা বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থাকে আপন করে নিয়েছেন, একে অপরের প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিপদে-আপদে তারা প্রমাণ করেছেন যে, একটি সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশের মূল্য যেকোনো সাময়িক অসুবিধার চেয়ে অনেক বেশি। এই ধৈর্য আর ত্যাগই আজ এই সফলতাকে স্থায়িত্ব দিয়েছে। অটোরিকশা বন্ধের এক বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে আজ নিকুঞ্জ ও খিলক্ষেত টানপাড়ার প্রতিটি কোণ যেন উৎসবমুখর। রাস্তার ধারের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ফুটপাত যেন এই সফলতার গল্প বলছে।

জনঐক্যের যে বীজ গত বছরের ৩০ এপ্রিল বপন করা হয়েছিল, তা আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, এই শৃঙ্খলা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আগামীতেও অটুট থাকবে। তারা কেবল নিজেদের এলাকাকে রক্ষা করেননি, বরং আগামীর প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন এক নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবীর হাতছানি। সব পরিবর্তনের শেষে যে পরম প্রশান্তি ফিরে এসেছে, তা ধরে রাখাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। তবে যে জনপদ একবার সুশৃঙ্খল ও সুন্দর জীবনের স্বাদ পেয়েছে, তাকে আর পেছনে ফেরানো সম্ভব নয়। নিকুঞ্জ আজ শুধু একটি আবাসিক এলাকার নাম নয়, এটি একটি চেতনার নাম। যে চেতনা বলে—আমরা চাইলে আমাদের পরিবেশ আমরাই রক্ষা করতে পারি। জাহিদ ইকবালের ভাষায়, “সব পরিবর্তনের পেছনে থাকে একটা সাহসী সিদ্ধান্ত, আর কিছু জেগে ওঠা মানুষ। নিকুঞ্জ আজ তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।”
অটোরিকশা মুক্ত এই এক বছর কেবল একটি মাইলফলক নয়, বরং এটি একটি আধুনিক ও সভ্য সমাজের নতুন জয়যাত্রা। শেষ বিকেলে নিকুঞ্জের লেকের পাড়ে বা খিলক্ষেত টানপাড়ার খোলা জায়গায় যখন মানুষ জড়ো হয়, তখন তাদের চোখেমুখে দেখা যায় এক অদ্ভুত তৃপ্তি। তারা সফল হয়েছেন। তারা প্রমাণ করেছেন যে রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ন্যায্য দাবিতে অবিচল থাকলে বিজয় সুনিশ্চিত।
আরও পড়ুনঃ ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন, দ্বিতীয় দিনের ভোট গ্রহণ শুরু
সারা বাংলাদেশের প্রতিটি আবাসিক এলাকায় আজ নিকুঞ্জের এই গল্প মুখে মুখে ফিরছে। একটি সাহসী পদক্ষেপ কীভাবে একটি জনপদের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, নিকুঞ্জ আজ তার সাক্ষী। এই বিজয় প্রতিটি সচেতন নাগরিকের, যারা বিশ্বাস করেছিলেন যে নিজেদের হাতেই ফিরিয়ে আনতে হবে হারানো শান্তি। আর সেই বিশ্বাস থেকেই আজ নিকুঞ্জ এক শান্ত, স্নিগ্ধ ও নিরাপদ জনপদ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

