নেছারাবাদে সমবায়ের নামে প্রতারণা, নিঃস্ব হাজারো পরিবার

নেছারাবাদে সমবায়ের নামে প্রতারণা, নিঃস্ব হাজারো পরিবার

২৯ April ২০২৬ Wednesday ১২:১৪:০৩ PM

Print this E-mail this


নেছারাবাদ ((পিরোজপুর) প্রতিনিধি:

পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার পূর্ব জলাবাড়ি গ্রামের অঞ্জলি রানী। বয়স চল্লিশের কোঠায়। স্বামীহারা এই নারী দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় জমিয়েছিলেন দেড় লাখ টাকা। লক্ষ্য ছিল মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার সময় টাকাগুলো কাজে লাগানো। কিন্তু দ্বিগুণ লাভের আশায় আটঘর কুড়িয়ানা এলাকার আতা গ্রামের উত্তম মিস্ত্রীর পরিচালিত ‘আতা বহুমুখী সমবায় সমিতি’তে টাকা জমা রেখে আজ তিনি চরম বিপদে। লাভ তো দূরের কথা, নিজের আসল টাকাও ফেরত পাচ্ছেন না। টাকা ফেরত চাইলে শুধু সময় দেওয়া হচ্ছে, আর অপমানজনক কথাও শুনতে হচ্ছে তাঁকে।

একই অবস্থা রিপন হালদারের (৪২)। ছোট ব্যবসায়ী রিপন একটি ভালো ঘর নির্মাণ ও ব্যবসা বাড়ানোর স্বপ্নে একই সমিতিতে সাত লাখ টাকা জমা দেন। এখন সেই টাকা ফেরত না পেয়ে তিনি দিশেহারা। টাকা চাইতে গেলে তাঁকে দেওয়া হচ্ছে হুমকি ও নানা অজুহাত।

শুধু অঞ্জলি রানী বা রিপন হালদার নন; নিমাই, সুখরঞ্জন, সুরুজ আলীসহ উপজেলার হাজার হাজার মানুষ এই সমবায় সমিতির কাছে প্রতারিত হয়েছেন। তাঁরা জমানো টাকা চাইতে গেলে টাকার পরিবর্তে তাঁদের দেওয়া হচ্ছে বাধাহীন সময়। তিন বছর ধরে বিভিন্ন মেয়াদে (দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক) আমানত সংগ্রহ করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ‘সময় লাগবে’ এই আশ্বাস দিয়েই ঘোরানো হচ্ছে সবাইকে।

অভিযোগ রয়েছে, উত্তম মিস্ত্রী সমবায় সমিতির লাইসেন্স ব্যবহার করে ব্যাংকিং কার্যক্রমের মতো করে মোটা অঙ্কের আমানত সংগ্রহ করেছেন। গ্রামের দরিদ্র ও বেকার মানুষকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এবং দ্বিগুণ লাভের লোভ দেখিয়ে অন্তত শতকোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে নিয়োগপ্রাপ্ত লোকদের মাধ্যমে। সংগ্রহকৃত সেই টাকায় উত্তম মিস্ত্রী নামে-বেনামে করেছেন সম্পদের পাহাড়। কিনেছেন তিনটি লাইটার জাহাজ। এলাকায় গুঞ্জন উঠেছে সমবায়ের টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে থাকায় ইতিমধ্যে তিনি সেই লাইটার জাহাজের মধ্যে একটি বিক্রি করে দিয়েছেন এবং বাকি দুটো বিক্রির আলোচনা চলছে। 

অভিযোগ রয়েছে, ভুক্তভোগীদের চাপ বাড়ায় সম্পদ গোপনে বিক্রি করছেন তিনি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় তিনি সব সম্পদ বিক্রি করে পালিয়ে যেতে পারেন।

উত্তমের সমিতিতে চাকরি করা মানিক লাল রায় জানান, তিনি ওই সমিতিতে দীর্ঘ আট বছর চাকরি করেছেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল কেবল বড় বড় আমানতকারী সংগ্রহ করা। তিনি সে অনুযায়ী তাঁর নিজ গ্রাম পূর্ব জলাবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে একাই তিন হাজার সদস্য সংগ্রহ করে দিয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে আমানত জমা নিয়ে উত্তমকে দিয়েছেন। এখন উত্তম তিন বছর ধরে কাউকেই আমানত ফেরত দিচ্ছেন না। লোকজন টাকা না পেয়ে সবাই তাঁর কাছে আসছেন। মানিক বলেন, ‘আমি এখন দিশেহারা। পাওনাদারদের চাপে ঠিকমতো বাড়িঘরেও থাকতে পারছি না।’

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য উত্তমকে বাসায় গিয়ে পাওয়া যায়নি। তার নম্বরে ফোন দিলেও তিনি ফোন ধরছেন না। জানা গেছে, তিনি একাধিক সমবায় সমিতি খুলে প্রায় ১২ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় শতকোটি টাকা আমানত নিয়েছেন। বেশির ভাগ গ্রাহকের আমানত ফেরত দেওয়া হয়নি। যাদের আমানত ফেরত দেওয়া হয়েছে তাঁরাও মূল টাকার সব পায়নি।

নেছারাবাদ উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. রিয়াদ খান বলেন, ‘আমি এই এলাকায় মাত্র যোগদান করেছি। অভিযোগের ব্যাপারে আমার কিছু জানা হয়নি।’

নেছারাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘উত্তম মিস্ত্রী কাউকে টাকা দিচ্ছে না। মৌখিক অভিযোগ শুনেছি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত দত্ত বলেন, ‘সমবায় কর্মকর্তা এর দায় এড়াতে পারে না। যেহেতু তারা উত্তম মিস্ত্রীকে লাইসেন্স দিয়েছিল। তা ছাড়া আমিও বিষয়টি দেখব।’ 

ভুক্তভোগীরা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তাঁদের একটাই দাবি, কষ্টের উপার্জিত টাকা যেন দ্রুত ফেরত পাওয়া যায় এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হয়।

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

Explore More Districts