| ১০ April ২০২৬ Friday ১০:৩৮:৫০ PM | |
বিশেষ প্রতিনিধি:

বরিশাল নগরীর অলিগলিসহ বিভিন্ন ফাঁকা প্লটে সন্ধ্যা হলেই একদল বখাটে কিশোরদের উৎপাত চোখে পড়ে। নিরীহ ও অপরিচিত লোক দেখলেই এরা হামলে পড়ে। বাসাবাড়ির মেয়েরা এদের ভয়ে ঘর থেকে বের হতে পারেনা। এমন অসংখ্য অভিযোগ পেয়েও কিছুই করার নেই, সামাজিকভাবে এদের প্রতিহত করতে হবে বলে জানিয়েছেন বরিশালের মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। আর পুলিশ কমিশনার বলেছেন আগামী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বৈঠকে এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
এই বখাটে কিশোরদের বেশ কয়েকজন নেতা রয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে এরা এসে জড়ো হয়, পাড়া-মহল্লার কোনো একটি নিরাপদ স্থানে। তারপর কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মার্কেট, প্রধান সড়ক সংলগ্ন খাবারের দোকানের আশেপাশে। অভিনব কৌশলে ফাঁদ পাতে সাধারণ পথচারীদের জন্য। প্রথমে একজন অতি অবুঝের মতো এসে ডাকে- ‘ভাইয়া একটু শুনবেন, তারপর আরো দুজন এসে পাশে দাঁড়িয়ে দর্শক হয়ে কথা বলার চেষ্টা…। এরপর আরো দুজন বদরাগী ভঙ্গিতে এসেই এলোপাথাড়ি চড়থাপ্পড় এবং টানতে টানতে নিরিবিলি গলি বা
নগরবাসীর সেবা দিতে পুলিশের অবহেলা নাকি ভয় এ নিয়েও রয়েছে সংশয়। তবে বরিশাল নগরীসহ আশেপাশের উপজেলা ও ইউনিয়ন থেকে প্রতিনিয়ত কিশোর গ্যাং এর দৌরাত্ম্য বৃদ্ধির অভিযোগ আসছে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও।
এভাবেই অভিনব কৌশলে জড়ো হচ্ছে ওরা পার্কে, পর্যটন স্পষ্টে। ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সের একদল কিশোর। বেশিরভাগ অংশ ওরা মাদকাসক্ত। পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে, কোনো বাড়ির পিছনে অন্ধকার কোনে কিম্বা নগরীর খালপাড় ওদের আড্ডাস্থল। বাসাবাড়ির কোনাকাঞ্চিতে দলবেধে জড়ো হওয়া ওদের ভয়ে ভীত আশেপাশের বাসিন্দারাও। এরাই আবার মাদকের টাকা জোগাড় করতে মহাসড়ক বা মার্কেটের সামনে এসে পথচারীদের সবকিছু ছিনতাই করছে ।
গত ১২ মার্চ সন্ধ্যার কিছু পরে এমনই চিত্র দেখা গেছে বরিশালের চৌমাথা বাজার পার হয়ে সিএন্ডবি মহাসড়কে তাওয়া রেস্তোরাঁর সামনে। মা ও বোনের সামনে থেকে ভাইকে ডেকে নিয়ে একজন কথা বলা শুরু করে। এসময় আরো তিন-চারজন এসে কলার ধরে টেনে নিয়ে ছিনতাই চেষ্টা করে, কিন্তু টাকা না থাকায় ওরা ঐ ব্যক্তিকে মারধর শুরু করলে মা ও বোনের চিৎকারে আশপাশের দোকানদারেরা ছুটে আসে। তখন উল্টো মা-বোন ও ভাইকে ছিনতাইকারী আখ্যা দিয়ে ওরা সরে যায়। এতে বোঝা যায় এলাকার দোকানদারেরা এবং আশেপাশের বাসিন্দারাও এদের চেনেন। তাওয়া রেস্তোরাঁর কর্মচারী বা ম্যানেজার কেউই এদের সম্পর্কে কোনো কথা বলতে রাজী হয়নি। আশেপাশের চা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজনের সাথে কথা বলে যেটা জানা গেল, আমতলা মোড়ের সিকদার পাড়া ও খান সড়কের পিছনে খাল পাড় সংলগ্ন এলাকায় এদের ঘাঁটি। দলনেতা রাহাত নামের কিশোর। বাসিন্দারা বললেন, এদের কিছু আছে নবগ্রাম রোডের আবার কিছু বিহারী কলোনি থেকেও এসে জড়ো হয়। এদের বাবা-মায়ের ঠিকঠিকানা আছে বলে মনে হয়না। থাকলে সন্তান কোথায় কি করছে, সে খোঁজ নেওয়া বাবা-মায়ের দায়িত্ব বলে জানান তারা।
আবার কেউ বলেন, বাবা-মায়ের কথা শোনার মতো ছেলে এরা নয়, খান সড়কের একজন কিশোরকে দেখিয়ে বললেন, ওর বড়ভাই বাবা-মাকে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছে।
সরেজমিনে নগরীর নবগ্রাম রোড, সিকদার পাড়া, কাজীপাড়া, সাগরদি, কাউনিয়া ঘুরে সাধারণ মানুষ, পথচারী ও স্থানীয় দোকানদারদের সাথে কথা বলে জানা যায়-আগেতো শুধু স্কুল কলেজে র্যাগিং, দলবেধে দু গ্রুপের মারামারি এতেই সীমিত ছিল এদের আগ্রাসন। এখন এরা দিন দুপুরেই দেশীয় হাতিয়ার নিয়ে মহড়া দিচ্ছে। কেউ কিছু বললে দলবেধে তার ঘরের সামনে ঘুরঘুর করছে। ফলে ভয়ে কেউ আর মুখ খুলছে না।
আমতলা মোড়ের স্বাধীনতা পার্ক এলাকায় এদের একটি বড় চক্র রয়েছে। আগে এক কাউন্সিলর এর সহকারী একজন এদের আশ্রয় দিত, এখন বিএনপি নেতার ছত্রছায়ায় পাড়া-মহল্লার ভিতর অরাজকতা চালাচ্ছে বলে জানান স্থানীয় এক বাসিন্দা।
একজন বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, আমতলা মোড়ের খান সড়কের সৈয়দ মঞ্জিলের পাশে চম্পা ভিলার দেয়ালে রাহাত গ্রুপের আড্ডা। এখানে আড্ডা না দেওয়ার জন্য বাসিন্দারা একাধিকবার তাদের অনুরোধ জানিয়েছে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা বাড়ির দেয়ালে যাচ্ছেতাই লিখে নিজেদের নাম সই করে দিয়েছে। এখন রাত ১১/১২টা পর্যন্ত ওখানে আড্ডা দেয় ও মাদক সেবন করে এই বখাটেরা। বিষয়টি থানায় জানালে পুলিশ বলছে ‘আমরা গেলেই ওরা আগেভাগে টের পেয়ে পালিয়ে যায়। কাউকে ধরা যায়না।
একই অবস্থা নগরীর মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, ত্রিশ গোডাউন, বেলসপার্ক, জিলা স্কুল এলাকা ছাড়াও খান সড়কের ভিতরে খাল পাড় সংলগ্ন খালি প্লটগুলোতে এই কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত দিনকে দিন বাড়ছে।
কোথাও পুলিশ কাউকে ধরতে পারেনা। এলাকাবাসীর কাছে এটাও একটি রহস্য। এছাড়াও ভাটিখানা, দপ্তরখানা, কাটপট্টি, কাউনিয়া, পলাশপুর, কেডিসি, বিএম স্কুল, কলেজ-রোড, কাশিপুর, নথুল্লাবাদ, রূপাতলী, বাংলাবাজারে সক্রিয় বেশ কিছু কিশোর গ্যাং সংগঠন। এসব দলের এক বা একাধিক ফেসবুক গ্রুপ রয়েছে বিভিন্ন নামে। এদের কারো কারো বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে বিনীত অনুরোধ থাকবে তারা যেন তাদের কর্মকা-ে কিশোরদের জড়িত না করেন। রাজনৈতিক কর্মকা-ে জড়িত হয়ে এসব ছেলেরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার কারণে পারিবারিক ও সামাজিকভাবেও এদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বাবা-মা সচেতন না হলে শুধু মামলা দিয়ে এদের সংশোধন করা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল মামুন উল ইসলাম বলেন, আমরা অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নিচ্ছি। তাছাড়া পুলিশি তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। স্কুল-কলেজ চলাকালীন আমাদের টহল গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি করেছি। তবে এদের ধরা কঠিন। এদের সামাজিকভাবে প্রতিহত করতে হবে।
এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, কিশোর গ্যাং সদস্যদের তালিকা করা হয়েছে। শিগগিরই তাদের আইনের আওতায় আনতে আমরা কাজ শুরু করব। কিশোর গ্যাং সদস্যদের পেছনে যদি কোনো রাঘববোয়াল থাকে তাদেরও ধরা হবে। আগামী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতির বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
তিনি বলেন, রাত নটার পরও কোনো স্কুল-কলেজ পড়ুয়া সন্তানকে বাইরে আড্ডারত পাওয়া গেলে, সেজন্য সবার আগে বাবা-মাকে জবাবদিহি করতে হবে।
সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক
| শেয়ার করতে ক্লিক করুন: | Tweet |


