ওই দিন আমার জন্মদিন ছিল না

ওই দিন আমার জন্মদিন ছিল না

হালিমা চুপ করে থাকে। ঠোঁটে হাসি, চোখে একধরনের শূন্যতা। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে ১২ ভাই–বোন এক হাঁড়ির ভাত ভাগ করে খেত, জন্মদিন কী জিনিস, ওদের কারও কল্পনাতেও ছিল না।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে হালিমা বোনকে মেসেজ লিখতে শুরু করে—‘তোর মনে আছে, আজ আমাদের জন্মদিন ছিল। কিন্তু এটা আমাদের আসল জন্মদিন নয়…।’ এতটুকু লিখে মুছে ফেলে। মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করে হালিমা। অন্ধকার ঘরে কেবল ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে বাজে, যেন সময় নিজেই প্রশ্ন করছে নিজেকে।

‘তোমার জন্ম কয় তারিখে হইছিল, উম্মে হালিমা?’

হালিমা ভাবতে থাকে, ওর জন্ম হয়েছিল এমন এক দরিদ্র পরিবারে, যেখানে কারও আলাদা করে জন্মদিন ছিল না। ছিল শুধু দিন আর রাত, আর অভাবের সঙ্গে লড়াই। ১২ ভাই–বোনের মধ্যে ও ছিল মাঝামাঝি কোথাও, যেন নামহীন এক ছায়া। বড়রা মাঠে কাজ করতে যেত, ছোটরা উঠানে পা ছড়িয়ে কাঁদত, আর ও রান্নাঘরের দরজায় খালি পায়ে দাঁড়িয়ে থাকত, কথা না বললে কেউ ওকে খেয়ালই করত না।

বাড়ির ছেলেমেয়েরা প্রাইমারি স্কুলের পরে আর পড়াশোনা করত না। হালিমা আর খাদিজা তবু স্কুল বৃত্তি পেয়ে এসএসসি পর্যন্ত পড়েছিল। হালিমার খুব ভালো লাগত বইয়ের ঘ্রাণ, কিন্তু ওর পরিবারের কাছে পড়াশোনা ছিল বিলাসিতা।

হালিমার মায়ের মুখে চিরদিন একধরনের ক্লান্তি লেগে থাকত, যেন জীবনটা সন্তান ধারণ আর ঘরকন্নার সীমাহীন কাজের মধ্যে গড়িয়ে গেছে নিঃশব্দে।

তারপর একদিন ওদের বাড়িতে একজন বয়স্ক লোক এল। ভদ্রলোকের সব চুল পাকা, বিপত্নীক, ছেলেমেয়ে সবার বিয়ে হয়ে গেছে। বৃদ্ধ বয়সে দেখাশোনা করার জন্য একজন স্ত্রী দরকার।

কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল না হালিমাকে, শুধু বিয়েটা হয়ে গেল।

বিয়ের রাতে হালিমা বসে ছিল ঘরের কোণে, হাতে মেহেদি শুকায়নি তখনো। লোকটির বয়স ওর চেয়ে প্রায় ৩৫ বছর বেশি। তবে লোকটা সহৃদয় ছিল। নিজের বেশি বয়সের কথা ভেবে স্ত্রীকে নিউইয়র্কে একটা অ্যাডাল্ট স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। বুড়ো বয়সে এক কন্যাসন্তানের পিতা হবার পরে বুঝলেন সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল।

ওই সন্তানই হালিমার জীবনের একমাত্র আলো, তবু আলোটা যেন দূরে কোথাও, ধোঁয়ার মধ্যে ভাসে।

ভোরে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে বড় বোন উম্মে শরিফার মোবাইল ফোনে কল করে হালিমা।

Explore More Districts