একদিকে মুসলমান সমাজে মুদ্রণমাধ্যমের বরাতে নতুন ধরনের সম্পর্কজাল (নেটওয়ার্কিং) যেমন নিবিড় ও শক্তিশালী হচ্ছিল, একই সঙ্গে তাদের নিজ সমাজে সরদারি কে করবে সেই প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছিল। সমাজের সরদার ও দিশারি কে হবে, সেই প্রশ্নেই মোল্লা বনাম তরুণ এই দ্বিধাবিভাজন প্রবল হলো। নজরুল আগে থেকেই গোঁড়াপন্থী মোল্লাদের প্রতি ক্রিটিক্যাল ছিলেন। কাব্য-আমপারার উৎসর্গপত্রে (১৯৩৩ সাল) মৌলবি সাহেবদের নায়েবে-নবি বলে প্রগাঢ় শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন নজরুল, কিন্তু কাঠমোল্লাদের প্রতি তাঁর ছিল অশ্রদ্ধা। সওগাত পত্রিকার রসাত্মক লেখা ‘চানাচুরে’ নজরুল বলেন, ‘মওলানা মৌলবি সাহেবকে সওয়া যায়, মোল্লাকেও চক্ষু-কর্ণ বুঁজিয়া সহিতে পারি। কিন্তু কাঠমোল্লার অত্যাচার অসহ্য হইয়া উঠিয়াছে। ইসলামের কল্যাণের নামে ইহারা যে কওমের, জাতির, ধর্মের কি অনিষ্ট করিতেছেন, তাহা বুঝিবার মতো জ্ঞান নাই বলিয়াই ইহাদের ক্ষমা করা যায়। ইহারা প্রায় প্রত্যেকেই ‘মনে মনে শাহ ফরিদ, বগল-মে ইট’।… ইহাদের ফতুয়া-ভরা ফতোয়া। বিবি তালাক ও কুফরির ফতোয়া তো ইহাদের জাম্বিল হাতড়াইলে দুই দশ গণ্ডা পাওয়া যাইবে। এই ফতুয়াধারী ফতোয়াবাজদের হাত হইতে গরিবদের বাঁচাইতে যদি কেহ পারে তো সে তরুণ।… চোগা-চাপকান দাড়ি-টুপি দিয়া মুসলমান মাপিবার দিন চলিয়া গিয়াছে।’
কারা ছিল এই ‘তরুণ’? ইয়ং বেঙ্গল, ইয়ং জার্মানি ইত্যাদি ধারণার প্রায় এক শ বছর পর ইয়ং তুর্ক হয়ে পরে এল বাঙালি মুসলমানের ‘তরুণ’ দল। সে তরুণদের পরিচয় মেলে আবুল মনসুর আহমদের লেখায়। তিনি লেখেন যে কলকাতায় গিয়ে তাঁরা ‘দরিদ্র মেসের ভাঙ্গা চৌকির ময়লা-ছেঁড়া বিছানায় শুইয়া-বসিয়া… দুনিয়ার মুসলমানদের ভাগ্য আলোচনা’ করতেন। এই আলোচনায় তাঁরা মুসলমানের চিন্তা, বুদ্ধি ও জ্ঞানের সংকটকেই প্রধান সমস্যা শনাক্ত করলেন। মুসলমান আজ ‘ইসলামের ভাল আদর্শ ত্যাগ করিয়া’ শুধু নামাজ-রোজার মতো সওয়াব কামানোর ‘আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই ধর্ম সাধনাকে সীমাবদ্ধ করিয়াছে।’ এই ‘সার্বিক অধঃপতনের জন্য দায়ী মোল্লারা’, যারা ‘ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা’ করে ‘মুসলমান জনসাধারণকে অজ্ঞান ও দারিদ্র্যের মধ্যে ডুবাইয়া রাখিয়াছে।’ তাদের মধ্যে পরলোকমুখিতা বাড়ার ফলে ইহলৌকিক ধনের আশা তারা ছেড়েছে। এই উপলব্ধি থেকে মনসুর ও তাঁর সমমনারা উঠে পড়ে লাগলেন পরিস্থিতি বদলের জন্য। ‘সবাই মোল্লাবিরোধী লেখা চালাইতাম। ডা. লুৎফর রহমান, এস ওয়াজেদ আলী, কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী আবদুল ওদুদ, হুমায়ুন কবির, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ও আমি চুটাইয়া মোল্লাবিরোধী অভিযান শুরু করিলাম।’ মৌলবি মুজিবর রহমান সম্পাদিত দি মুসলমান পত্রিকার সহকর্মী মৌলবি আবুল হায়াত, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ও আবুল কালাম শামসুদ্দীনের সঙ্গে আবুল মনসুর ‘অ্যান্টি-মোল্লা লীগ’ গঠনে নামলেন। মৌলবি মুজিবর রহমান তাঁদের পরামর্শ দিলেন মোল্লা বিদ্বেষ না করে মোল্লাকির বিরোধিতা করতে। (আহমদ, আত্মকথা) কাছাকাছি সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে শিখা গোষ্ঠী ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন শুরু করেছে।
বলা বাহুল্য তুরস্কে কামালের সংস্কার আর তার দেখাদেখি ইরান, আফগানিস্তান ইত্যাদি দেশে যেসব সংস্কার আরোপ করা হচ্ছিল, তার ঢেউ এসে আলোড়ন তুলছিল বাঙালি মুসলমান সমাজে।


