ড. আমানুর আমান
সংখ্যা কখনও কখনও মানুষের অনুভূতিকে গ্রাস করে ফেলে। একটি শিশুর মৃত্যু আমাদের কাঁদায়, দশটি মৃত্যু আমাদের উদ্বিগ্ন করে, কিন্তু যখন সংখ্যাটি ৮০৩-এ পৌঁছে যায়, তখন যেন তা কেবল একটি পরিসংখ্যান হয়ে দাঁড়ায়। সংবাদপত্রে একটি শিরোনাম, টেলিভিশনের স্ক্রলে কয়েক সেকেন্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি ক্ষণস্থায়ী প্রতিক্রিয়া—তারপর আবার সব আগের মতো। অথচ এই ৮০৩ সংখ্যার প্রতিটি অঙ্কের পেছনে রয়েছে একটি করে শিশুর জীবন, একটি পরিবারের স্বপ্ন, একজন মায়ের ১০ মাস ১০ দিনের বুকফাটা কান্না এবং একটি রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতার ইতিহাস।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে ৮০৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৯৫ জন, আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ৭০৮ শিশু। একই সময়ে সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে এক লাখ ২০ হাজার, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক লাখেরও বেশি শিশু। এগুলো কেবল স্বাস্থ্য-পরিসংখ্যান নয়; এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির কঠিন প্রশ্ন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই মৃত্যুগুলো যেন ধীরে ধীরে আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। প্রতিদিন কয়েকজন করে শিশু মারা যাচ্ছে, আমরা খবরটি পড়ছি, তারপর পরের সংবাদে চলে যাচ্ছি। এ যেন এমন এক সামাজিক অসাড়তা, যেখানে মৃত্যুও আর আমাদের নাড়া দেয় না। যেন আমরা মেনে নিয়েছি, এটাই বাস্তবতা।
কিন্তু বাস্তবতা কি সত্যিই এমন হওয়ার কথা ছিল?
রাজনৈতিক দার্শনিক হান্না আরেন্ট ((Hannah Arendt)- আমাদের শিখিয়েছেন, অস্বাভাবিককে যখন সমাজ স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করে, তখন নৈতিক অবক্ষয় গভীরতর হয়।
হাম এমন কোনো অজানা রোগ নয়, যার প্রতিষেধক মানবসভ্যতা এখনো আবিষ্কার করতে পারেনি। কার্যকর টিকা বহু দশক ধরে বিদ্যমান। বিশ্বের বহু দেশ এই রোগ প্রায় নির্মূল করেছে। তাহলে বাংলাদেশে শত শত শিশুর মৃত্যু কি কেবল ভাইরাসের শক্তির কারণে? নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি, দুর্বল নজরদারি, অসম স্বাস্থ্যসেবা, প্রশাসনিক বিলম্ব এবং নীতিগত ব্যর্থতা?
জনস্বাস্থ্যে একটি মৌলিক সত্য আছে—মহামারি কখনো হঠাৎ আসে না। তার আগে থাকে অসংখ্য সতর্ক সংকেত। বিচ্ছিন্ন সংক্রমণ, টিকাদানের ফাঁক, মাঠপর্যায়ের তথ্য, রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ—সবই ভবিষ্যৎ বিপদের পূর্বাভাস দেয়। সেই সংকেতগুলো সময়মতো পড়তে না পারলে মৃত্যুর দায় কেবল জীবাণুর ওপর বর্তায় না; তার একটি অংশ ব্যবস্থার ওপরও বর্তায়।
সেই কারণেই এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি প্রশ্ন—জবাবদিহি। এতগুলো শিশুর মৃত্যুর পর আমরা কি জানি কোথায় টিকাদানে সবচেয়ে বড় ঘাটতি ছিল? কোন জেলাগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল? নজরদারি কোথায় ব্যর্থ হয়েছে? কোন সিদ্ধান্ত দেরিতে নেওয়া হয়েছে? কী শিক্ষা নেওয়া হয়েছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই ব্যর্থতার দায় কে নেবে?
একটি পরিণত রাষ্ট্রে জবাবদিহি কোনো প্রতিশোধের ভাষা নয়; এটি আত্মসমালোচনার ভাষা। ভুল স্বীকার করা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে না; বরং আরও বিশ্বাসযোগ্য করে। কিন্তু যখন শত শত শিশুর মৃত্যুর পরও তদন্ত, মূল্যায়ন কিংবা দায় নির্ধারণের দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায় না, তখন নাগরিকের উদ্বেগ আরও গভীর হয়। কারণ ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি শুধু অতীতকে অন্ধকার করে না; ভবিষ্যৎকেও অনিরাপদ করে তোলে।
মনোবিজ্ঞানে একটি ধারণা রয়েছে—Psychic Numbing। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, একটি মানুষের দুর্ভোগ আমাদের হৃদয়কে যতটা নাড়া দেয়, হাজার মানুষের দুর্ভোগ প্রায়ই ততটা দেয় না। সংখ্যা যত বাড়ে, সহমর্মিতা তত কমে। এটি মানুষের মানসিক সীমাবদ্ধতা; কিন্তু একটি সভ্য সমাজের দায়িত্ব হলো সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করা। কারণ প্রতিটি সংখ্যা আসলে একজন মানুষ। যদি আমরা এই ৮০৩ শিশুর প্রত্যেকের নাম, মুখ, স্বপ্ন ও পরিবারের গল্প জানতাম, তাহলে হয়তো এই নীরবতা এত দীর্ঘ হতো না।
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জবাবদিহির। এতগুলো শিশুর মৃত্যুর পরও কি আমরা জানি কোথায় কোথায় টিকাদানে ঘাটতি ছিল? কোন এলাকায় নজরদারি ব্যর্থ হয়েছে? কেন এত বিপুলসংখ্যক শিশু আক্রান্ত হলো? কারা দায়িত্বে ছিলেন? কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর আজও সাধারণ মানুষ জানে না।
আরও বেদনাদায়ক হলো—এই মৃত্যুর জন্য কার্যত কাউকে দায়ী করা যাচ্ছে না। কোনো তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন জনসমক্ষে নেই, কারও বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেই, এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অভিযোগ জানানোর কার্যকর সুযোগও পায়নি। যেন এতগুলো শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কাছে একটি দুর্ভাগ্যজনক পরিসংখ্যান মাত্র, কোনো দায়বদ্ধতার বিষয় নয়।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জবাবদিহি কেবল আদালতের বিষয় নয়; এটি একটি নৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব। যখন শত শত শিশু প্রতিরোধযোগ্য রোগে মারা যায়, তখন প্রশ্ন তোলাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়, বরং নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা উচিত। কারণ প্রতিটি শিশুর জীবনের মূল্য সমান। কোনো সংখ্যাই সেই মূল্যকে কমিয়ে দিতে পারে না।
এই পরিস্থিতি আমাদের আরেকটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—সংখ্যা যত বাড়ে, মানুষের সংবেদনশীলতা তত কমে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় “psychic numbing”—বড় সংখ্যার ট্র্যাজেডি মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে স্পর্শ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ৮০৩ একটি সংখ্যা; কিন্তু যদি আমরা তাদের প্রত্যেকের নাম, মুখ, পরিবার এবং গল্প জানতাম, তাহলে হয়তো এই নীরবতা থাকত না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে জনপরিসরে তারা সংখ্যা হয়ে গেছে, মানুষ নয়।
স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় সরকারের নানা উদ্যোগ নিশ্চয়ই রয়েছে। চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা দিনরাত কাজ করছেন। কিন্তু একটি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি সেই সংকটের কারণ অনুসন্ধান করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেবল আক্রান্তদের চিকিৎসা করলেই হবে না; কেন এত শিশু আক্রান্ত হলো, কেন টিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেল না, কেন আগাম সতর্কতা যথেষ্ট কার্যকর ছিল না—এসব প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হবে।
এখন প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য পর্যালোচনা। কোথায় ব্যর্থতা ছিল, কোথায় সক্ষমতার ঘাটতি ছিল, ভবিষ্যতে কীভাবে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো যাবে—এসব বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন জরুরি। জনস্বাস্থ্যে আস্থা তৈরি হয় তথ্য গোপন করে নয়, বরং তথ্য প্রকাশ, ভুল স্বীকার এবং সংশোধনের মাধ্যমে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু অবকাঠামো নির্মাণে নয়; সবচেয়ে দুর্বল নাগরিককে কতটা সুরক্ষা দিতে পারে, সেটিতেও। শিশুরা নিজেদের জন্য দাবি জানাতে পারে না। তাদের হয়ে কথা বলার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সমাজের, গণমাধ্যমের এবং আমাদের সবার।
৮০৩ শিশু আর কখনো ফিরে আসবে না। কিন্তু তাদের মৃত্যু যদি আমাদের বিবেককে না জাগায়, যদি আমরা কেবল পরের দিনের নতুন পরিসংখ্যানের অপেক্ষায় থাকি, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে আমাদের মানবিকতার।
প্রশ্নটি তাই কেবল স্বাস্থ্য খাতের নয়। প্রশ্নটি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার, প্রশাসনিক জবাবদিহির এবং আমাদের সামাজিক বিবেকের।
আমরা কি এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে শত শত শিশুর মৃত্যুও আর আমাদের নাড়া দেয় না? নাকি এখনও সময় আছে—প্রতিটি মৃত্যুকে একটি পরিসংখ্যান নয়, একটি হারিয়ে যাওয়া জীবনের গল্প হিসেবে দেখার?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, আমরা কেবল মৃত্যুর সংখ্যা গুনি, নাকি মৃত্যুর কারণ বদলানোর সাহসও রাখি।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস
৮০৩ শিশু মৃত্যূ: সংখ্যার নৈতিক অভিঘাত /মৃত্যুর হিসাব আছে, দায়ের হিসাব কোথায়?
- Tags : ৮০৩, অভঘত, আছ, কথয, দয়র, নতক, মতয, মতযর, শশ, সখযর, হসব
Recent Posts
Explore More Districts
- Khulna District Newspapers
- Chattogram District Newspapers
- Dhaka District Newspapers
- Barisal District Newspapers
- Sylhet District Newspapers
- Rangpur District Newspapers
- Rajshahi District Newspapers
- Mymensingh District Newspapers
- Gazipur District Newspapers
- Cumilla district Newspapers
- Noakhali District Newspapers
- Faridpur District Newspapers
- Pabna District Newspapers
- Narayanganj District Newspapers
- Narsingdi District Newspapers
- Kushtia District Newspapers
- Dinajpur District Newspapers
- Bogura District Newspapers
- Jessore District Newspapers
- Bagerhat District Newspapers
- Barguna District Newspapers
- Bhola District Newspapers
- Brahmanbaria District Newspapers
- Chuadanga District Newspapers
- Chandpur District Newspapers
- Chapainawabganj District Newspapers
- Coxs Bazar District Newspapers
- Feni District Newspapers
- Gaibandha District Newspapers
- Gopalganj District Newspapers
- Habiganj District Newspapers
- Jamalpur District Newspapers
- Jhalokati District Newspapers
- Jhenaidah District Newspapers
- Joypurhat District Newspapers
- Kurigram District Newspapers
- Kishoreganj District Newspapers
- Khagrachhari District Newspapers
- Lakshmipur District Newspapers
- Lalmonirhat District Newspapers
- Madaripur District Newspapers
- Magura District Newspapers
- Manikganj District Newspapers
- Meherpur District Newspapers
- Naogaon District Newspapers
- Munshiganj District Newspapers
- Moulvibazar District Newspapers
- Narail District Newspapers
- Natore District Newspapers
- Netrokona District Newspapers
- Nilphamari District Newspapers
- Panchagarh District Newspapers
- Patuakhali District Newspapers
- Pirojpur District Newspapers
- Rajbari District Newspapers
- Rangamati District Newspapers
- Satkhira District Newspapers
- Shariatpur District Newspapers
- Sherpur District Newspapers
- Sirajganj District Newspapers
- Sunamganj District Newspapers
- Tangail District Newspapers
- Thakurgaon District Newspapers

