সুন্দরবনের জলপথে যাঁকে ভরসা করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা, মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়েই বিতর্ক

সুন্দরবনের জলপথে যাঁকে ভরসা করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা, মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়েই বিতর্ক

৩০ October ২০২৬ Friday ১১:২৯:৩৪ PM

Print this E-mail this


সুন্দরবনের জলপথে যাঁকে ভরসা করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা, মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়েই বিতর্ক

একদিকে সুন্দরবনের দুর্গম জলপথ। অন্যদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর নজরদারি। মাঝখানে নদী-খাল পেরিয়ে ভারতে যাওয়ার অপেক্ষায় শরণার্থী ও প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী তরুণেরা।

সেই কঠিন সময়ে নৌকায় করে তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতেন মানিক পশারী। মুক্তিযুদ্ধে তিনি অস্ত্র হাতে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে ছিলেন না। তাঁর কাজ ছিল মানুষকে নিরাপদে সীমান্তের ওপারে পৌঁছে দেওয়া।

পিরোজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক আহমেদ শহিদুল হক এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, তাঁর বড় ভাই শহীদ ফজলুল হক খোকন প্রথম মানিক পশারী ও তাঁর চাচা রেয়াজ উদ্দিন পশারীকে এ কাজে নিয়োগ দেন। পরে সুন্দরবন এলাকায় অবস্থানকালে সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউদ্দিনও তাঁদের নিজের অধীনে কাজ করতে অনুরোধ করেন।

আহমেদ শহিদুল হক বলেন, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌকা চালিয়ে শরণার্থী ও প্রশিক্ষণ নিতে ইচ্ছুক মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতে নিয়ে যেতেন মানিক পশারী।

এ ভূমিকার কারণেই তাঁকে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ১৯৮০ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম তালিকা তৈরি হয়।

তখন আহমেদ শহিদুল হক পিরোজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন মহকুমা ইউনিটের দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় তিনি মানিক পশারীকে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে সহায়তা করেন।

পরে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধার পৃথক শ্রেণি বিলুপ্ত হয়। তখন মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয়।

সম্প্রতি সেই পরিচয় নিয়েই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী পিরোজপুর জেলা শাখা, পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী ও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা তাঁকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ বলে দাবি করেছেন।

তাঁদের অভিযোগ, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

এই বিতর্কের মধ্যেই মানিক পশারীর মৃত্যু হয়। এরপর তাঁর গার্ড অব অনার ও দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার দিন গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন মাসুদ সাঈদী।

তিনি সাঈদীর ছেলে ও জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য। পোস্টে তিনি বলেন, মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে তাঁদের কোনো আপত্তি ছিল না। আপত্তি ছিল রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া নিয়ে।

মাসুদ সাঈদীর দাবি, মানিক পশারী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। জনতার আপত্তির মুখেও প্রশাসন তাঁকে গার্ড অব অনার দিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মানিক নিজেই স্বীকার করেছিলেন, তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেননি। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছিলেন।

পোস্টে তৎকালীন সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়ালের দেওয়া একটি ডিও লেটারের কথাও উল্লেখ করেন মাসুদ। তাঁর দাবি, ওই চিঠির ভিত্তিতেই মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় মানিক পশারীর নাম ওঠে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, কর্মকর্তা ও যাচাই-বাছাই কমিটির ভূমিকা তদন্তের দাবি জানান তিনি।

এদিকে গার্ড অব অনার ও দাফনে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার মানববন্ধন হয়েছে। পিরোজপুর মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের সামনে এ কর্মসূচি পালন করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পিরোজপুর সদর উপজেলা কমান্ড।

মানববন্ধনে আহমেদ শহিদুল হক বলেন, মানিক পশারীর মরদেহ পিরোজপুরে পৌঁছানোর দিন তাঁরা পুষ্পস্তবক নিয়ে সদর উপজেলা পরিষদে যান।

তখন একদল লোক তাঁর কাছ থেকে সেটি ছিনিয়ে নিয়ে বাইরে ফেলে দেয়। এ ঘটনায় তাঁরা কর্মসূচি বাতিল করেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় রাতে দাফনেও যাননি মুক্তিযোদ্ধারা।

আহমেদ শহিদুল হক আরও বলেন, মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে আপত্তি থাকলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক ছড়ানো ঠিক নয়। তথ্যপ্রমাণসহ জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে আবেদন করতে হবে।

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

Explore More Districts