সিলেটে অনলাইন জুয়ায় তরুণদের আসক্তি, বাড়ছে অশান্তি ও অপরাধ

সিলেটে অনলাইন জুয়ায় তরুণদের আসক্তি, বাড়ছে অশান্তি ও অপরাধ

সিলেটে অনলাইন জুয়ায় তরুণদের আসক্তি, বাড়ছে অশান্তি ও অপরাধসিলেটে তরুণ সমাজের মধ্যে রাতজাগার প্রবণতা দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন, স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং নিয়ন্ত্রণহীন ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে অনেক তরুণ-তরুণী এখন গভীর রাত পর্যন্ত অনলাইনে সক্রিয় থাকছে। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটাচ্ছে, আবার অনেকে অনলাইন গেম, জুয়া কিংবা বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে রাতজাগা এখন অনেকের কাছে এক ধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
রাতভর জেগে থাকা এবং দিনের বড় একটি সময় ঘুমিয়ে কাটানোর কারণে তরুণদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। পড়াশোনায় অমনোযোগ, কর্মক্ষমতা হ্রাস, পারিবারিক দূরত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যাও বাড়ছে। বিশেষ করে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া তরুণদের একটি অংশ রাতের নিরিবিলি সময়কে বেছে নিচ্ছে গোপনে বেটিং বা অর্থ লেনদেনের জন্য।
দীর্ঘদিন অনিয়মিত ঘুম ও অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া, মনোযোগ কমে যাওয়া, খিটখিটে মেজাজ, উদ্বেগ, হতাশা ও আচরণগত পরিবর্তনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিশোর ও তরুণদের ব্রেইনের স্বাভাবিক বিকাশেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে মত দিয়েছেন তারা।

অভিভাবকরাও বলছেন, অনেক তরুণ এখন রাতভর মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সকালে ঘুমাতে যায়। এতে পরিবারে যোগাযোগ কমছে, সন্তানদের আচরণে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে এবং তারা ধীরে ধীরে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তরুণ সমাজকে এই ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে ফিরিয়ে আনতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং ইতিবাচক সামাজিক কার্যক্রমে তরুণদের সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্মার্টফোন আর সহজ ইন্টারনেট সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সিলেটে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অনলাইন জুয়ার বিস্তার। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন অনলাইন বেটিং, ক্যাসিনো ও জুয়ার অ্যাপে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এতে অনেক পরিবারে নেমে এসেছে আর্থিক সংকট, বাড়ছে মানসিক চাপ, পারিবারিক কলহ ও সামাজিক অপরাধ।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো: আজিজুল হাকিম বাপ্পা বলেন, অনলাইন জুয়া (Gambling) এক ধরণের আচরণগত আসক্তি। মাদক কিংবা অন্যান্য আসক্তির ন্যায় এটিও একধরনের মানসিক রোগ। কেউ অনলাইন জুয়াতে আসক্ত হয়ে গেলে সে উচ্ছন্নে গেছে, বখে গেছে না ভেবে এটিকে একটি রোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, দ্রুত লাভের প্রলোভন এবং বন্ধুদের মাধ্যমে পরিচয়ের কারণে সহজেই তরুণরা অনলাইন জুয়ার দিকে ঝুঁকছে। ক্রিকেট, ফুটবল, তাস, ক্যাসিনো কিংবা বিভিন্ন গেমিং অ্যাপের আড়ালে চলছে টাকার লেনদেন। শুরুতে অল্প টাকা দিয়ে খেললেও পরে অনেকেই বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। অনলাইন জুয়া এক ধরনের আচরণগত আসক্তি, যা ধীরে ধীরে মানুষের মানসিক ভারসাম্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দীর্ঘদিন এ আসক্তিতে থাকলে হতাশা, উদ্বেগ, অনিদ্রা এমনকি আত্মঘাতী প্রবণতাও দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, এর চিকিৎসা আছে এবং এটি নিরাময়যোগ্য। ঔষধ, বাধ্যতামূলক ভর্তি এবং কাউন্সেলিং/সাইকোথেরাপির মাধ্যমে এধরণের রোগীকে পুনরায় সুস্থ জীবনে ফিরে আনা সম্ভব।

সিলেট নগরীর উপশহর এলাকার এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “প্রথমে বন্ধুদের সঙ্গে মজা করে খেলা শুরু করেছিলাম। পরে প্রতিদিনই টাকা লাগাতে শুরু করি। কয়েক মাসে প্রায় এক লাখ টাকা হারিয়েছি। এখন পরিবার থেকেও বিষয়টি লুকিয়ে চলতে হচ্ছে।”

একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেন, সন্তানদের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অনেকেই রাত জেগে মোবাইল ব্যবহার করছে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করছে এবং টাকার জন্য মিথ্যা বলছে। কেউ কেউ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন বলেও জানান তারা।

সিলেট মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন সময় অভিযানে জড়িতদের আটকও করা হয়েছে। তবে প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং গোপন লেনদেনের কারণে এসব নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

সচেতন মহল মনে করছে, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই এ সমস্যা সমাধান হবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অনলাইন জুয়ার ভয়াবহ প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় সামাজিক সংকটে পরিণত হতে পারে।

 

ডিএস/এমসি

Explore More Districts