
বেইজিং, ২১ সেপ্টেম্বর – সমুদ্রপৃষ্ঠে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের গল্প পুরনো হলেও এবার সমুদ্রের তলদেশে গভীর জলের নিচে আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক অনন্য নজির গড়েছেন চীনা গবেষকরা। পানির প্রায় ১০ মিটার বা ৩৩ ফুট গভীরে বিশেষ প্রযুক্তির সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সফলতা পেয়েছেন তারা। ‘ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়’-এর একদল গবেষকের তৈরি এই প্রযুক্তি বৈশ্বিক সোলার টেকনোলজি ও সামুদ্রিক বিজ্ঞান অনুসন্ধানে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জুল’ (Joule)-এ গত ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই বৈপ্লবিক উদ্ভাবনের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়।
দক্ষিণ চীন সাগরে রোবোটিক পরীক্ষা ও প্রাপ্ত ফলাফল
গবেষক দল দক্ষিণ চীন সাগরের তলদেশে একটি বিশেষ রোবটের সাহায্যে ১১৫ বর্গ সেন্টিমিটার আয়তনের সোলার প্যানেল নামিয়ে এই গভীর সমুদ্র পরীক্ষা পরিচালনা করেন। পানির তিনটি ভিন্ন গভীরতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার পর্যবেক্ষণ করা হয়:
সমুদ্রের গভীরতা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ
- ২ মিটার গভীরে ১,৪১৬ মিলিওয়াট-ঘণ্টা
- ৬ মিটার গভীরে ৭৫২ মিলিওয়াট-ঘণ্টা
- ১০ মিটার গভীরে ৩২৪ মিলিওয়াট-ঘণ্টা
পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ দিয়ে সমুদ্রের নিচেই ব্যাটারি চার্জ করার পাশাপাশি অত্যন্ত সফলভাবে এলইডি (LED) লাইট জ্বালানো সম্ভব হয়েছে।
নীল-সবুজ আলোর খেলা ও প্যানেলের অভিনব রসায়ন
গবেষক ওয়েন-হুয়া ঝাং জানান, পানির নিচে প্রবেশের পর সূর্যালোকের লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য দ্রুত শোষিত হয়ে যায়। তবে ৫ থেকে ১০ মিটার গভীরতায় নীল ও সবুজ আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য তুলনামূলক বেশি পৌঁছায়।
তরঙ্গদৈর্ঘ্য নির্বাচন: বিজ্ঞানীদের দল প্যানেলটিকে এমনভাবে ডিজাইন করেছেন যেন তা মূলত ৪০০ থেকে ৬০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (নীল ও সবুজ আলো) সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারে।
পেরোভস্কাইট ও পলিমারের যুগলবন্দি: এতে ব্যবহৃত হয়েছে ‘সীসা-হ্যালাইড পেরোভস্কাইট’ নামক সেমিকন্ডাক্টর। স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য এর সাথে ‘পলিহেক্সামেথিলিন গুয়ানিডিন হাইড্রোক্লোরাইড’ পলিমার যুক্ত করা হয়েছে, যা সোলার প্যানেলের ইলেকট্রন ধরে রাখার সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
দীর্ঘ স্থায়িত্ব: গবেষকদের দাবি, এই বিশেষ প্যানেলগুলো পানির নিচে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে কার্যকর থাকতে পারবে।
কেন এই উদ্ভাবন বিজ্ঞান বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
অতীতে পানির নিচে সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কিত অধিকাংশ গবেষণাই সর্বোচ্চ ২ মিটার গভীরতার মধ্যে থমকে ছিল। সমুদ্রের ১০ মিটার গভীরে এই প্রযুক্তির সফল ব্যবহার গভীর সমুদ্রে চালিত স্বয়ংক্রিয় সেন্সর, শনাক্তকারী ডিভাইস, রোবোটিক মনিটরিং ব্যবস্থা এবং যোগাযোগ ডিভাইসে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে বিপ্লব আনবে। তার কিংবা বারবার ব্যাটারি বদলানোর ঝক্কি ছাড়াই ভবিষ্যৎ সামুদ্রিক অনুসন্ধান ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়ে যাওয়া এখন আরও সহজ হবে।
এনএন/ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

