জাহিদ আনোয়ার জাকির
পুরাতন ফৌজদারি কোর্ট প্রাঙ্গণ—বর্তমান সেটেলমেন্ট অফিসের শতবর্ষী বটজাতীয় পাইকের গাছটি আজ, ১৪ জুলাই ভোরে, চিরতরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। একটি গাছের পতন যেন কেবল একটি বৃক্ষের অবসান নয়; এটি একটি দীর্ঘ ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্মৃতি ও জনজীবনের নীরব অধ্যায়ের সমাপ্তি। এই বিশাল বৃক্ষটি যুগের পর যুগ ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় আদালতে আসা অসংখ্য সহায়-অসহায় মানুষের দুঃখ, বেদনা, আশা আর অপেক্ষার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার ছায়াতলে কত বিচারপ্রার্থী বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে রায়ের অপেক্ষা করেছে, কত মানুষের চোখে ফুটে উঠেছে ন্যায় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। একসময় এই গাছের নিচেই বসত ম্যাজিশিয়ানদের বিস্ময়কর প্রদর্শনী, আর সর্ব রোগের মহৌষধের রঙিন আহ্বানে মুখর থাকত প্রাঙ্গণ। আদালতের এজলাসে ডাকের অপেক্ষায় থাকা মানুষজন সেই ছায়াতলেই কাটিয়ে দিত দীর্ঘ সময়। হাসি, গল্প, উদ্বেগ আর প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে গাছটি হয়ে উঠেছিল জনজীবনের এক জীবন্ত ইতিহাস।
সময়ের স্রোত বদলেছে, আদালতের রূপ বদলেছে, কিন্তু গাছটি বদলায়নি। শেষ দিন পর্যন্তও তার সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় পেয়েছেন জমি রেকর্ড সংশোধন সেবাগ্রহীতারা। সে যেন মানুষের ক্লান্ত পথচলার এক নির্ভরতার ঠিকানা ছিল। আজ সেই শতবর্ষী বৃক্ষের নির্মম পতনে নিঃশেষ হলো একটি দৃশ্যমান ইতিহাসের শেষ চিহ্ন। যাতায়াতকারী মানুষের মুখে মুখে আজ উচ্চারিত হচ্ছে একই বেদনার কথা—একটি গাছ নয়, হারিয়ে গেল একটি যুগ, একটি স্মৃতি, একটি ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল।
প্রকৃতি, ইতিহাস আর মানুষের অনুভূতির এই অপূরণীয় ক্ষতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হয়তো বারবার মনে করিয়ে দেবে—ঐতিহ্য ধ্বংস করা সহজ, কিন্তু তার শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হয় না।
