লিচু বাগান বদলে দিচ্ছে পিরোজপুরের গ্রামীণ অর্থনীতি

লিচু বাগান বদলে দিচ্ছে পিরোজপুরের গ্রামীণ অর্থনীতি

১২ June ২০২৬ Friday ৪:০৩:৫৫ PM

Print this E-mail this


পিরোজপুর প্রতিনিধি:

লিচু বাগান বদলে দিচ্ছে পিরোজপুরের গ্রামীণ অর্থনীতি

সবুজ পাতার ফাঁকে থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল টুকটুকে লিচু। দেখলেই জুড়িয়ে যায় চোখ। লিচুর এমন সৌন্দর্য দেখতে ভিড় করছেন স্থানীয়রা। পিরোজপুরের বিভিন্ন উপজেলায় এখন এমন দৃশ্য চোখে পড়ছে হরহামেশাই। এক সময় শখের বশে বাড়ির আঙিনায় লিচু গাছ লাগানো হলেও এখন তা রূপ নিয়েছে বাণিজ্যিক চাষে।

এক সময় ধান আর মাছের জন্য পরিচিত পিরোজপুরে এখন বাড়ছে লিচুর বাণিজ্যিক চাষ। জেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট-বড় লিচু বাগান। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় অনেক কৃষক ঝুঁকছেন এ চাষে। 

পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার তারাবুনিয়া গ্রাম এখন পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘লিচু গ্রাম’ নামে। গ্রামের প্রবেশদ্বার থেকেই চোখে পড়ে গাছভর্তি লাল লিচুর দৃশ্য। বাগানজুড়ে নারী-পুরুষের ব্যস্ততা, কোথাও চলছে লিচু সংগ্রহ, কোথাও বাছাই, সব মিলিয়ে পুরো এলাকা এখন মৌসুমী উৎসবের আমেজে ভরপুর।

প্রায় দুই যুগ ধরে এই গ্রামে লিচু চাষ হয়ে আসছে। বর্তমানে গ্রামের শতাধিক পরিবার লিচু চাষের সঙ্গে যুক্ত। চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে গাছে আশানুরূপ ফলন হয়েছে। বিষমুক্ত বা অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ হওয়ায় তারাবুনিয়ার লিচুর চাহিদা স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায়ও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখানকার লিচু ফরমালিনমুক্ত, আকারে বড় ও সুস্বাদু হওয়ায় ব্যাপক চাহিদা রয়েছে স্থানীয়দের মাঝে। জেলায় তিন জাতের লিচু সব থেকে বেশি উৎপাদন হয়। এর মধ্যে রয়েছে বেদানা, চায়না-৩, বোম্বাই। স্থানীয় বাজারের চাহিদার পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় পাইকাররা নিয়ে বিক্রি করছে। নাজিরপুর, পিরোজপুর, শ্রীরাম কাঠি, টুংগীপাড়া, বাগেরহাটসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় এখানকার লিচুর চাহিদা রয়েছে।

লিচু চাষিরা বলছেন, আশপাশে স্থানীয় বাজারগুলোর পাইকাররা এসে লিচু নিয়ে যায়। লিচু শত প্রতি পাইকারি বিক্রি হয় ৩৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৩৮০ টাকা পর্যন্ত। 

তবে সহজ শর্তে ঋণ পেলে এই ফসল আরও বেশি উৎপাদন বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে জানান তারা। লিচু ছাড়াও এখানে আম, বড়ই, ড্রাগনসহ বেশ কয়েকটি ফলের চাষ হচ্ছে এই গ্রামে। সফল চাষিদের দেখে অনেকেই উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন এই ফল চাষে। তবে সরকার থেকে সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা থাকলে আরও বেশি উদ্যোক্তার সৃষ্টি হবে।

তারাবুনিয়া গ্রামের লিচু চাষি হিমাংশু মিস্ত্রি বলেন, আমাদের এখানে ৫ বিঘা জমির উপরে লিচুবাগান। এ বছর ফলন ভালো হয়েছে, প্রতি হাজার লিচু ৩৫০০ টাকা বিক্রি করতেছি। আমাদের এখানে লিচু বাগেরহাট, পিরোজপুর, গোপালগঞ্জ, কাউখালী, নেছারাবাদসহ বিভিন্ন জায়গায় যায়। এ বছর ফসল ভালো হয়েছে এর জন্য দামটা একটু কম।

লিচু চাষি হংসপ্রতি মিস্ত্রি বলেন, গত বছরের থেকে এ বছর ফলন ভালো হইছে। গত বছর কোনো লিচু বিক্রি করতে পারি নাই। আশা করি, এ বছর লাভবান হতে পারব। এই এলাকায় লিচু, আম, বড়ইসহ অনেক ফল চাষ হয়। অনেক দূর থেকে মানুষ ঘুরতে আসে লিচু বাগান দেখার জন্য।

চাষি শিবু চক্রবর্তী বলেন, গত বছর যা লস হইছে, এ বছরটা মোটামুটি টেনে উঠতে পারব। ফলন বৃদ্ধি করার জন্য কৃষি অফিসের আরও বেশি সহযোগিতা প্রয়োজন।

লিচু বাগানের নারী শ্রমিক গীতা রানী বলেন, বাগানে এসে লিচু তুলি, লিচু বুনি, লিচু আলাদা করি। বেপারীরা লিচু কিনতে আসে তাদের সাহায্য করি। এই লিচু বাগানে আমরা ১০ থেকে ১২ জন লোক কাজ করি। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত লিচু ভাঙতে হয়। সারাক্ষণ পাইকাররা আসতে থাকে তাদের লিচু উঠিয়ে দেই।

৫নং শাঁখারিকাঠি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. খালিদ হোসেন সজল বলেন, এই এলাকার লিচু রাজশাহী উত্তরাঞ্চলের লিচুর থেকে অনেক বেশি ভালো এবং এটা ফরমালিনমুক্ত। বাজারে অন্যান্য লিচুর থেকে এখানকার লিচুর চাহিদা বেশি। চাষিরা লিচু কোথাও নিয়ে যাচ্ছে না, পাইকাররা এসেই এখান থেকে লিচু নিয়ে যায়। এই লিচুর স্বাদ অন্যরকম, যেটা রাজশাহীসহ অন্যান্য অঞ্চলের লিচুর থেকে কম নয়। এই গ্রামের নাম তারাবুনিয়া কিন্তু বিভিন্ন ফল উৎপাদনের কারণে এখন ফলের গ্রাম নামে পরিচিত হয়ে উঠছে।

পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, পিরোজপুর জেলায় এ বছর প্রায় ৬৭ হাজার হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। এর উৎপাদন ৪০১ মেট্রিক টন। বাজার মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা। জেলার নাজিরপুর এবং নেছারাবাদ উপজেলায় বেশি চাষাবাদ হচ্ছে। এখানে চায়না থ্রি, বোম্বাই, মোজাফফর পুরি এবং স্থানীয় জাতের লিচু চাষ হচ্ছে। কৃষকদের আমরা বিভিন্ন রকমের টেকনিক্যাল পরামর্শ এবং গাছের পরিচর্যা এ জাতীয় পরামর্শ দিয়ে আসছি।

অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার গত বছরের তুলনায় ফলনও ভালো হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে গেল বছরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলে আশা করছেন কৃষকরা।

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

Explore More Districts