বান্দরবানে হামে আক্রান্ত দুই শিশু জানেনা তাদের মা আর নেই – দৈনিক আজাদী

বান্দরবানে হামে আক্রান্ত দুই শিশু জানেনা তাদের মা আর নেই – দৈনিক আজাদী

বান্দরবানের সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চার বছরের ডনওয়াই ম্রো ও দুই বছরের কাইংওয়াই ম্রো। দুজনই হামের সঙ্গে লড়ছে। কিন্তু তারা এখনো জানে না, তাদের জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, মমতাময়ী মা লেংরুম ম্রো আর পৃথিবীতে নেই।

শনিবার (০১ আগস্ট) দুপুরে বান্দরবান সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে দুই ভাই-বোন। কখনো তারা কাকার কোলে মাথা রাখছে, কখনো চারপাশে তাকিয়ে যেন মাকে খুঁজছে। কিন্তু যাকে খুঁজছে, তিনি আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না।

রুমা উপজেলার গ্যালেঙ্গ্যা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম চিনিপাড়ার বাসিন্দা ক্রংসং ম্রো (২৫) ও লেংরুম ম্রো (২৫) দম্পতি গত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে হামে আক্রান্ত দুই সন্তানকে নিয়ে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি হন।

হাসপাতালে দিন-রাত সন্তানদের সেবা-শুশ্রূষা করতে করতেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন মা লেংরুম ম্রো।হাসপাতালের চিকিৎসকরা তার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার জন্য রেফার করেন। কিন্তু চরম দারিদ্র্য, যাতায়াত ব্যয়ের সংকট এবং বাংলা ভাষা না জানার কারণে স্বামী ক্রংসং ম্রো স্ত্রীকে চট্টগ্রামে নিতে সাহস পাননি। উন্নত চিকিৎসার পরিবর্তে গ্রামের কবিরাজের চিকিৎসার আশায় তাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। কিন্তু ভাগ্য আর সুযোগ দেয়নি। ২৯ জুলাই সন্ধ্যায় গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পরই মারা যান লেংরুম ম্রো।

পরদিন পারিবারিকভাবে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। অন্যদিকে দুই শিশু তখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মায়ের মৃত্যুর খবর তাদের জানানো হয়নি। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তারা এখনো মায়ের অপেক্ষায়। শিশু দুটির দেখাশোনার দায়িত্ব এখন কাঁধে নিয়েছেন তাদের ১৯ বছর বয়সী কাকা ক্রংতন ম্রো ও মামা পায়াং ম্রো। দিন-রাত হাসপাতালে থেকে তারা দুই শিশুর সেবা করছেন।

বান্দরবানের রুমা উপজেলার স্থানীয় ও জনপ্রতিনিধিদের তথ্যমতে হাম উপসর্গে এই পর্যন্ত ৯জন শিশুর মুত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

ক্রংতন ম্রো বলেন, আমার দাদা নিরক্ষর। বাংলা ভাষাও ভালোভাবে বলতে পারেন না। হাতে কোনো টাকা-পয়সাও ছিল না। চিকিৎসকরা চট্টগ্রামে নিতে বললেও দাদা ভেবেছিলেন সেখানে অনেক টাকা লাগবে। তাই গ্রামের বৈদ্য-কবিরাজের চিকিৎসার আশায় ভাবিকে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে আর বাঁচানো গেল না।

তিনি আরও বলেন, আমাদের গ্রামের মানুষ জীবনে এই প্রথম বান্দরবান সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে। এর আগে কখনো হাসপাতালে আসার প্রয়োজন হয়নি। এখন দুই শিশুকে সুস্থ করে বাড়ি নিয়ে যাওয়াই আমাদের একমাত্র আশা। মায়ের স্নেহ হারিয়ে দুই শিশুর জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। হাসপাতালের একটি বিছানায় তারা হামের সঙ্গে লড়াই করছে, আর তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে পরিবারের সীমিত সামর্থ্য, চিকিৎসা এবং সমাজের মানবিক সহায়তার ওপর বলে জানান তিনি।

Explore More Districts