দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে ইতোমধ্যে ভোগ্যপণ্যের বাজার পড়তে শুরু করেছে। কারণ পরিবহন ভাড়া বাড়ার কারণে ভোগ্যপণ্যের দাম কেজিতে ২–৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি এবং ইয়েমেনের হুতিদের বাব আল–মান্দেব প্রণালি নিয়ন্ত্রণের কারণে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। এতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতি হয়েছে তা ঠিক। সরকার যেহেতু ডিজেলসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দিচ্ছে, তাই ডিজেলের দাম একসাথে লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো উচিত হয়নি। দুই–তিন ধাপে বাড়ালে জনগণ উপকৃত হতো। যে ট্রাক–কাভার্ডভ্যানের ভাড়া ২৫ হাজার টাকা নিত এখন সেই ভাড়া চালকরা ৬–৭ হাজার টাকা বেশি চাচ্ছেন। সব মিলিয়ে পরিবহন ব্যয় ১৫–২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে তা ভোগ্যপণ্যের ওপর প্রভাব পড়বে।
খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি কেজি চিনি ৩ টাকা বেড়ে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১০২ টাকায়। পেঁয়াজ ২ টাকা বেড়ে কেজিতে ৪০ টাকা, আদা কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে ৯৫ টাকা, রসুন কেজিতে ৪ টাকা বেড়ে ১২২ টাকা, ভারতীয় লাল মরিচ কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৩৫০ টাকা এবং ভারতীয় মিষ্টি মরিচ ৫ টাকা বেড়ে ৪৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে পঞ্চগড়ের দেশি মরিচ মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ২৮০ টাকা ৩১০ টাকা এবং হাটহাজারীর মিষ্টি মরিচ বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায়। ধনিয়ার কেজি মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৭০ টাকা এবং হলুদ বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ১৭৫ থেকে ২১০ টাকা।
গতকাল মোটা মসুর ডালের কেজি ২ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, চিকন মশুর ডাল ১৫৭ টাকা, মুগ ডালের কেজি ৮ টাকা বেড়ে ১৫০ টাকা, মটর ডাল কেজিতে ২ টাকা বেড়ে ৫৪ টাকা এবং সাদা মটর কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে ৫৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে স্থিতিশীল আছে ছোলার দাম। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৯৫ টাকায় এবং ভারতীয় ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৯৮ টাকায়। এছাড়া বর্তমানে এলাচ বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৩০ টাকা, জিরা কেজিতে ৪২০ টাকা, দারচিনি কেজিতে ৩৯৫ টাকা ও লবঙ্গ কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২৮০ টাকায়। পাম তেল মণে ৫০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৬০০ টাকায় এবং সয়াবিন তেল প্রতি মণে ৬০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৭ হাজার ৫০০ টাকায়।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবু বক্কর বলেন, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের বাজার বাড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ এখন ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাবে। খাতুনগঞ্জ থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পণ্য পরিবহন হয়। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে ওজন স্কেল স্থাপনের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণের কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে আমাদের এখানে পরিবহন ভাড়া এমনিতে একটু বেশি। এখন ডিজেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে পরিবহন ভাড়া আরো বাড়বে। খাতুনগঞ্জ থেকে সড়কপথ ছাড়াও নৌপথেও পণ্য পরিবহন হয়। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে লাইটাজারেজ জাহাজের ভাড়াও বাড়বে। এটিও পণ্যের দামের সাথে যুক্ত হবে। সাধারণ জনগণের কথা চিন্তা করে সরকার চাইলে ডিজেলে ভর্তুকির সময়টা আরেকটু বাড়াতে পারত।
চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এহসান উল্লাহ জাহেদী বলেন, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ভোগ্যপণ্যের বাজারে ইতোমধ্যে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যে গাড়ি শরীয়তপুর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ২৫ হাজার টাকায় ভাড়া করতাম, সেটি আজকে (গতকাল) ৩৪ হাজার টাকা ভাড়া চায়। এই বাড়তি ভাড়া তো পণ্যের সাথে যুক্ত হবে। কোনো ব্যবসায়ী তো আর লোকসান দিয়ে পণ্য বিক্রি করবেন না।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসেন বলেন, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে বাজারে এর প্রভাব শুরু হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা তাদের স্বভাবসুলভ পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবেন। মাঝখানে খরচের চাকায় পিষ্ট হবেন ক্রেতারা। এটাই সব সময় হয়ে আসছে। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানাব, জনগণের কথা চিন্তা করে যেন ভোগ্যপণ্যের বাজারে অভিযান চালানো হয়। কারণ ব্যবসায়ীরা একেক সময় একেক অজুহাতে পণ্যের দাম বৃদ্ধি করেন। তাদের অজুহাতের শেষ নেই।


