ঘুষ দুর্নীতিসহ ফৌজদারি মামলার বিচারে দৃশ্যমান গতি – দৈনিক আজাদী

নানা জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং বছরের পর বছর সাক্ষী হাজির না হওয়ায় দেশের ফৌজদারি বিচার কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসার নজির নতুন নয়। সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে বিচারকাজ থমকে যাওয়ার অহরহ উদাহরণ রয়েছে। তবে এই চিরাচরিত ধারার বিপরীতে এক ইতিবাচক পরিবর্তনের দেখা মিলেছে চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের ফৌজদারি মামলার বিচার কার্যক্রমে। আদালতটিতে থাকা বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে ৯০ শতাংশই হচ্ছে দুদকের মামলা। বাকী ১০ শতাংশ মামলা অন্যান্য ফৌজদারি মামলা। গত ১৫ মাসে এই আদালতে নাটকীয়ভাবে সাক্ষীর উপস্থিতি বেড়েছে, বেড়েছে মামলার নিষ্পত্তি ও সাজার হারও।

আদালত সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে বর্তমানে বিচারক হিসেবে রয়েছেন মো. মিজানুর রহমান। ২০২৫ সালের ১৬ জুন এই আদালতে যোগদান করেন তিনি। মূলত তার যোগদানের পর থেকেই আদালতটির বিচার কার্যক্রমে গতিশীলতা আসে।

আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের ১৫ জুন পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে (প্রায় সাড়ে সাত বছরে) মোট ২৯২১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছিল। পক্ষান্তরে, বর্তমান বিচারক যোগদানের পর ২০২৫ সালের ১৬ জুন থেকে চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১৫ মাসে ২৪৮৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, আগের দীর্ঘ সময়ের প্রায় কাছাকাছি সংখ্যক সাক্ষী কেবল গত ১৫ মাসেই আদালতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যা বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক। আদালতের পরিসংখ্যান বলছে, সাক্ষীর উপস্থিতি বাড়ায় পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মামলার রায় ও নিষ্পত্তি সংখ্যাও। পরিসংখ্যান অনুযায়ী২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের ১৫ জুন পর্যন্ত সময়ে মোট ৭৭৫ টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল। অন্যদিকে ২০২৫ সালের ১৬ জুন থেকে চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় তথা গত ১৫ মাসেই নিষ্পত্তি হয়েছে ৩২১টি মামলা। এর মধ্যে ১৯৭ টি মামলায় আসামির সাজা নিশ্চিত হয়েছে। খালাস পেয়েছে মাত্র ১০৪ টি মামলার আসামিরা। বাকী ২০ টি মামলা অন্যান্যভাবে নিষ্পত্তি হয়। তবে আগের প্রায় সাড়ে ৭ বছরে ৭৭৫ টি মামলার বিপরীতে মাত্র ৩৬৪ টি মামলায় আসামির সাজা হয়। বিপরীতে আসামি খালাস পেয়েছে এমন মামলার সংখ্যা সাড়ে ৩শ’। বাকীগুলো অন্যান্যভাবে নিষ্পত্তি হয়।

দুদকের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, গত ১৫ মাসে মামলার সাজার হার দাঁড়িয়েছে ৬২ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচারকের সদিচ্ছা, কঠোর মনিটরিং এবং প্রসিকিউশনের কার্যকর ভূমিকার কারণে সাক্ষীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘকাল ধরে ঝুলে থাকা ঘুষদুর্নীতি থেকে শুরু করে অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন, এমনকি অর্থপাচারসহ অন্যান্য ফৌজদারি মামলাগুলোর জট যেমন কমছে, তেমনি বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত ন্যায়বিচার পেতে শুরু করেছেন।

আদালত সূত্র জানায়, বর্তমানে চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে ৩২৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর আগে গত বছর তথা ২০২৫ সালে ৬১২ টি, ২০২৪ সালে ৬১৭টি, ২০২৩ সালে ৬২৮টি, ২০২২ সালে ৭৬১টি, ২০২১ সালে ৮৩২টি, ২০২০ সালে ৮১২ টি, ২০১৯ সালে ৮০১টি, ২০১৮ সালে ৭৮১টি ও ২০১৭ সালে ৭৫৪টি ফৌজদারি মামলা বিশেষ এ আদালতে বিচারাধীন ছিল।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পাবলিক প্রসিকিউটর মোকাররম হোসাইন দৈনিক আজাদীকে বলেন, সৎ উদ্দেশ্য থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব না। আমরা সবাই আন্তরিকতার সাথে কাজ করে যাচ্ছি। বিচারক মহোদয়ও খুবই আন্তরিক। যার ফলে মামলা নিষ্পত্তি বেশি হচ্ছে। তিনি বলেন, বিচারাধীন মামলায় সাক্ষী হাজির করানো খুবই কঠিন একটা বিষয়। অথচ সাক্ষী হচ্ছেন মামলার প্রাণ। আমরা সেই প্রাণটাকে আদালতে হাজির করাতে পারছি। যার কারণে গত ১৫ মাসে আড়াই হাজারের মতো সাক্ষীর সাক্ষ্য রেকর্ড করতে সক্ষম হয়েছে আদালত।

দুদকের আরেক পিপি রেজাউল করিম রনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, দীর্ঘ বছর ধরে বিচারাধীন থাকা মামলাও এখন নিষ্পত্তি হচ্ছে। আগে সাক্ষীদের হাজির করা হতো না, অনেক সময় দেখা যেত সাক্ষী হাজির কিন্তু সাক্ষ্য রেকর্ড হয়নি। এখন বিচারক যেমন পজিটিভ, আমরাও পজিটিভ। বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত থেকে মানুষ ন্যায়বিচার পাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

Explore More Districts