
ঢাকা, ২৯ জুলাই – সকালে আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজেই বলেছিলেন, “শাপলা চত্বরের হত্যাযজ্ঞ মামলায় আমি ১০ নম্বর আসামি। পুলিশ না ধরলে আগামী সপ্তাহেই ট্রাইব্যুনালে গিয়ে আত্মসমর্পণ করব।” কিন্তু সেই সুযোগ আর মিলল না। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে রাজধানীর গুলশানের নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
বুধবার (২৯ জুলাই) বিকেলে চালানো এই অভিযান নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরই তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয় পুলিশ।
নাটকীয় সকাল থেকে বিকেলের গ্রেপ্তারি: যেভাবে ঘনিয়ে এলো আইনি বেড়াজাল
বুধবার সকালের ঘটনা। ঢাকার শাহবাগ থানার একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিতে এসেছিলেন সাবেক এই প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সেখানে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপে নিজেই ফাঁস করেন শাপলা চত্বর মামলার একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
তিনি স্পষ্ট জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ কেন্দ্র করে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও হত্যাযজ্ঞের মামলায় তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ১০ নম্বর আসামি। আইনি প্রক্রিয়া এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বুঝে নিজেই আগামী সপ্তাহে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু গোয়েন্দা পুলিশ আর সময় নেয়নি; বিকেলেই গুলশানের বাসভবনে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও ৪১ আসামির দীর্ঘ তালিকা
২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরে তৎকালীন সরকার ও একাধিক বাহিনীর যৌথ অভিযানের পর ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। দীর্ঘ দিন পর সেই রক্তক্ষয়ী ঘটনা ট্রাইব্যুনালের আওতায় এসেছে।
গত সোমবার (২৭ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নেন। একই সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।
আলোচিত এই ট্রাইব্যুনাল মামলায় মোট ৪১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। যাদের মধ্যে তৎকালীন রাজনৈতিক নীতিনির্ধারক, শীর্ষ পুলিশ ও সেনাকর্তা এবং সুশীল সমাজের একাধিক মুখ রয়েছেন:
রাজনৈতিক নেতৃত্ব: শেখ হাসিনা, ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, শামসুল হক টুকু, হাসানুল হক ইনু, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ড. আব্দুর রাজ্জাক, মাহবুবউল আলম হানিফ, হাছান মাহমুদ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ডা. দীপু মনি, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া প্রমুখ।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী: সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, মোটরসাইকেল ও পুলিশ বাহিনী প্রধানদের মধ্যে বেনজীর আহমেদ, এ কে এম শহীদুল হক, জাবেদ পাটোয়ারী, জিয়াউল আহসান, হারুন-অর-রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার, আসাদুজ্জামানসহ অনেকে।
অন্যান্য পরিচিত মুখ: শাহরিয়ার কবির, মোজাম্মেল বাবু, ফারজানা রুপা এবং ডা. ইমরান এইচ সরকার।
জালে বেশ কিছু ‘হেভিওয়েট’ আসামি: বিচার কোন পথে?
লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে এই ট্রাইব্যুনাল মামলায় মোট গ্রেপ্তারকৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ জনে। এর আগে থেকেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে কিংবা কারাগারে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার কবির, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল এবং সাবেক সম্প্রচার ব্যক্তিত্ব মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের সেই বিভীষিকাময় রাতের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ট্রাইব্যুনালের এই তড়িৎ পদক্ষেপ দেশের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। একসময়ের প্রতাপশালী মন্ত্রীদের পর্যায়ক্রমে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর এই প্রক্রিয়া প্রকাশ করে যে, ২০১৩-র সেই স্পর্শকাতর ঘটনার আইনি দায়বদ্ধতা এড়ানোর সুযোগ এখন আর কারও নেই।
সকালের প্রগলভ বক্তব্য আর বিকেলের হাতকড়া—লতিফ সিদ্দিকীর এই দ্রুত পরিণতিই প্রমাণ করে, শাপলা চত্বর মামলার তদন্ত এবং বিচার কাজ এখন চরম গতি পেয়েছে।
এনএন/ ২৯ জুলাই ২০২৬



