
তেল আবিব, ২০ মে – ইসরায়েলের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় ও নজিরবিহীন ভূমিকম্প ঘটে গেল। দেশটির পার্লামেন্ট ‘নেসেট’ বিলুপ্ত করা এবং আগাম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটি প্রাথমিক বিল বিপুল ভোটে পাস হয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিলের পক্ষে ভোট পড়েছে ১১০টি, আর বিপক্ষে একটি ভোটও পড়েনি। অর্থাৎ, খোদ ক্ষমতাসীন জোটের আইনপ্রণেতারাও এখন নেতানিয়াহু সরকারের বিদায় চান।
বুধবার (২০ মে) নেসেটের স্পিকার আমির ওহানা এই ঐতিহাসিক ভোটাভুটির ফলাফল নিশ্চিত করেন। তবে কাকতালীয়ভাবে, এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভোটাভুটির সময় একটি ‘নিরাপত্তা সংক্রান্ত জরুরি বৈঠক’-এর দোহাই দিয়ে নেসেট অধিবেশনে অনুপস্থিত ছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরাজয় নিশ্চিত জেনেই তিনি কৌশলে এই অধিবেশন এড়িয়ে গেছেন।
এই বিলটি প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়ায় ইসরায়েলে আগাম নির্বাচনের পথ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশস্ত হলো। তবে এটি চূড়ান্ত আইনে পরিণত হওয়ার আগে আরও কয়েকটি আইনি ও সংসদীয় পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যাবে।
ইসরায়েলের বর্তমান সংবিধান ও রাজনৈতিক ক্যালেন্ডার কী বলছে, তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক:
সর্বশেষ নির্বাচন: ২০২২ সালের মে মাসে।
সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী ভোটের তারিখ: চলতি ২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর।
আগাম নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি দ্রুত ঐকমত্য তৈরি হয়, তবে পূর্বনির্ধারিত সময়ের আগেই অর্থাৎ আগামী সেপ্টেম্বর নাগাদ আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। অন্যথায়, অক্টোবরের নির্ধারিত সময়েই ভোট হবে।
পিঠে ছুরি মারল কট্টরপন্থি ইহুদি দলগুলো!
নেতানিয়াহুর দল ‘লিকুদ পার্টি’র ঐতিহাসিক এবং সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে পরিচিত কট্টরপন্থি ইহুদি দলগুলোই মূলত এই পরিস্থিতির পেছনে মূল কারিগর। চলতি মে মাসেই তারা তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে নিয়েছে। দলগুলো এখন প্রকাশ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, তারা নেতানিয়াহুকে আর জোটের নেতা বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায় না এবং তারা সরাসরি আগাম নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতার লোভে অন্ধ নেতানিয়াহু এতদিন যাদের ওপর ভর করে টিকে ছিলেন, সেই কট্টরপন্থিরাই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক একাধিক জনমত জরিপের তথ্য বলছে, নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে। গাজা যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ নানা কেলেঙ্কারির কারণে সাধারণ ভোটারদের একটি বিশাল অংশ তাঁর ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। শুধু সাধারণ মানুষই নয়, খোদ জোটসঙ্গীরাও বুঝে গেছে যে নেতানিয়াহুর নৌকায় থাকলে তাদেরও ডুবতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন সেপ্টেম্বরে হোক বা অক্টোবরে—নেতানিয়াহু এবং তাঁর লিকুদ পার্টির পুনরায় ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা এখন প্রায় শূন্য।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, কট্টরপন্থি দলগুলো যখন নেতানিয়াহুকে পছন্দই করছে না, তবে তারা এখনই সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে জোট ভেঙে দিচ্ছে না কেন? এর পেছনে রয়েছে একটি গভীর কৌশলগত জটিলতা।
যদি এই মুহূর্তে সরকার ভেঙে পড়ে, তবে নির্বাচনের আগে একটি নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা ইসরায়েলের বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ হবে। মূলত এই প্রশাসনিক শূন্যতা এড়াতেই কট্টরপন্থি দলগুলো এখনই লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করছে না। তারা চাচ্ছে আইনি প্রক্রিয়ায় পার্লামেন্ট বিলুপ্ত করে সরাসরি নির্বাচনের টেবিলে যেতে।
নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এর আগেও বহু ঝড় এসেছে, যা তিনি চতুরতার সাথে সামলে নিয়েছেন। কিন্তু এবার নিজের ঘর থেকেই যেভাবে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে, তাতে “কিং অব সারভাইভাল” খ্যাত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সমাপ্তি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এনএন/ ২০ মে ২০২৬




