জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি আধুনিক শহর গড়তে নতুন রূপরেখা – দৈনিক আজাদী

জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি আধুনিক শহর গড়তে নতুন রূপরেখা – দৈনিক আজাদী

দীর্ঘদিনের সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি নগরবাসীকে একটি আধুনিক, নান্দনিক ও পরিবেশবান্ধব শহর উপহার দিতে সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে। উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে নগরের খালগুলোর পানিপ্রবাহ সচল রেখে বড় বড় খালগুলোতে জলযান চালুর সুযোগ সৃষ্টি, খালপাড়ে ওয়াকওয়ে ও সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য বৃক্ষরোপণ। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের সুফল পেতে এবং অর্থের অপচয় রোধে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক), সিডিএ, ওয়াসা ও বন্দরসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে কাজের সমন্বয় নিশ্চিত করা হবে।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে টাইগারপাস চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রাম মহানগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। সভা শেষে সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন সভার প্রধান অতিথি এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম–৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম–৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন, সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন বিগ্রেডের বিগ্রেড কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম শামস, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম ও জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

সামষ্টিক সমস্যার সামষ্টিক সমাধানের কথা বললেন অর্থমন্ত্রী : আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরের জলাবদ্ধতার সার্বিক সমস্যা ও এলাকাভিত্তিক কী সমস্যা আছে সেটা নিয়ে আমরা দীর্ঘ আলোচনা করেছি। যে কাজগুলো হয়েছে, সে কাজগুলোকে আমরা ইভালুয়েট করেছি এবং বাকি কাজগুলো আছে, সেগুলো আগামী দিনে প্রজেক্টের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরে জলাবদ্ধতার সমস্যা বহুদিন ধরে চলছে, এটার জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রজেক্ট হয়েছে। কিন্তু আমাদের যেটা প্রয়োজন, সেটা হচ্ছে সামষ্টিক একটা সমাধান দিতে হবে।

খসরু বলেন, আগে পিসমিল (খণ্ড খণ্ড ও বিচ্ছিন্ন) ছোট ছোট প্রজেক্ট বা ক্রমান্বয়ে প্রজেক্টের ওপর প্রজেক্ট চলছে, কিন্তু একটা প্রজেক্ট শেষ হওয়ার আগে অন্যদিকে সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে। এই জন্য সামষ্টিক একটা সমাধানের সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি। এক্ষেত্রে যে কাজগুলো হয়েছে, এগুলোকে আরও কীভাবে একটা উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরে তো হাঁটার কোনো জায়গা নেই। প্রত্যেকটি এলাকায় আমরা চেষ্টা করব খালের দুই পাড়ে ওয়াকওয়েগুলো যাতে করতে পারি, ওই অঞ্চলের মানুষগুলো যাতে হাঁটাচলা করতে পারে। সাথে সাথে যেখানে সুযোগ আছে সেখানে সাইকেল ট্র্যাক করতে চাই, যাতে লোকজন সাইকেলে যাতায়াত করতে পারে কিংবা সাইক্লিংয়ের এঙারসাইজও করতে পারে। বড় যে খালগুলো এখানে জলযান চলার একটা সুযোগ আমরা সৃষ্টি করতে চাই।

অর্থমন্ত্রী বলেন, জলযান, ওয়াকওয়ে, সাইক্লিং, এই তিনটা আমরা এঙিস্টিং যে প্রজেক্টগুলো আছে সেখানে ইনকর্পোরেট করার চেষ্টা করছি। আগামী দিনে যে প্রজেক্টগুলো আসবে, সেখানেও এই তিনটা এলিমেন্ট আমরা যোগ করতে চাচ্ছি। যাতে করে একসাথে জলাবদ্ধতার সমাধান হয়, জলযান চলার একটা সুযোগ থাকে, জনগণের হাঁটার একটা ব্যবস্থা হয় এবং জনগণের সাইক্লিং করার একটা সুযোগ থাকে সমস্ত মহানগরে। সাথে সাথে গাছ লাগানোর কথাটাও বলতে হবে।

গাছ লাগানোর বিষয়ে খসরু বলেন, ২৫ কোটি গাছ লাগানোর বিশাল একটা প্রোগ্রাম আছে প্রধানমন্ত্রীর। সুতরাং এই সব জায়গায় যেখানে সুযোগ সেখানে গাছ লাগাতে হবে। এটা একদিকে নান্দনিকতার বিষয় অন্যদিকে পরিবেশ এবং মহানগরের যে এয়ার কোয়ালিটি, সেটার একটা বিষয় আছে এখানে। সবকিছু মিলিয়ে আমরা আগামী দিনে ইনশাল্লাহ একটা সামষ্টিক সমাধানের দিকে যাচ্ছি।

আমির খসরু বলেন, যে কাজগুলো হয়ে গেছে এটার সাথে বাকি কাজগুলোকে যোগ করে চট্টগ্রাম মহানগরে জনগণের সুবিধার্থে, জনগণ যাতে স্বস্তি পায়, এরকম একটা পরিবেশ আমরা গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। আশা করি আগামী দিনে প্রকল্পের মাধ্যমে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই কাজগুলো আমরা সমাধান করব ইনশাল্লাহ।

আমির খসরু বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ, ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিদ্যুৎ ও বন্দরসহ যারা স্টেকহোল্ডার আছে সবাই মিলে রেগুলার রিভিউ করবে প্রতি মাসে। রিভিউয়ের মাধ্যমে সহযোগিতা–সমন্বয়ের মাধ্যমে যাতে কাজগুলো হয়। যাতে জনগণের দৈনন্দিন জীবনে অসুবিধা না করে কাজগুলো করা যায়। তাছাড়া সমন্বয়ের মাধ্যমে হলে অর্থের যে অপচয় হয় সেটা বন্ধ হবে, কাজগুলো সুন্দরভাবে হবে এবং কম সময়ের মধ্যে হবে।

তিনি বলেন, আমরা শুধু জলাবদ্ধতার সমাধান চাচ্ছি না, সাথে সাথে জনগণের স্বস্তির জন্য এবং জনগণ যাতে নিঃশ্বাস ফেলতে পারে তার জন্য একটা নান্দনিক শহর গড়তে চাচ্ছি। একটা শহর যেখানে মানুষ নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে, হাঁটতে পারবে, সাইকেল চালাতে পারবে, একটা জলযানের মধ্যে ট্রিপে যেতে পারবে এবং অনেক বিষয় আছে এটার সাথে। সুতরাং আমরা একটা কম্পোজিট, সবকিছু মিলিয়ে সামষ্টিক সমাধানের দিকে যাচ্ছি।

প্রকল্পে বরাদ্দ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু বলেন, বরাদ্দ তো প্রজেক্ট আসার পরে দেব। এখানে তো আর বরাদ্দ দেওয়া যাবে না। আমি বলেছি, সামষ্টিক সমস্যার সামষ্টিক সমাধানের জন্য যত প্রকল্প আছে সবকটি প্রকল্প নিয়ে আসতে হবে। নিয়ে আসলে বরাদ্দের প্রশ্ন আসবে। খসরু বলেন, চট্টগ্রাম হচ্ছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বিশাল নগর ও বাণিজ্যিক রাজধানী। চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের জন্য না, এই রিজিয়নের জন্য আমরা একটা লজিস্টিক সেন্টার করতে যাচ্ছি। চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টের উন্নয়ন এটার সাথে জড়িত, পোর্টগুলোর উন্নয়ন জড়িত। এখানে আমরা ফ্রি জোন করছি, বিদেশি জোনগুলো আসছে, আরও আসবে। চট্টগ্রামকে আগামী দিনে একটি ইকোনমিক হাব হবে, শুধু বাংলাদেশের জন্য না, পুরো রিজিয়নের জন্য। এটার সাথে এই জলাবদ্ধতার বিষয়টাও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, এজন্য এটার সমাধান দিতে হবে।

সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মনোয়ারা বেগম, জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর গৃহীত মেগা প্রকল্পের পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মহসিন, সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূইয়া, চসিকের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শামীম মোহাম্মদ খান, বন্দর কর্তৃপক্ষের চীফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার মো. ওবায়দুর রহমান ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের গৃহীত প্রকল্পের পরিচালক কর্নেল তারিকুল আলম, শাহরিয়ার খালেদ।

সভায় কে কী বললেন : সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন বিগ্রেডের বিগ্রেড কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল শামছুল আলম শামস বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্প প্রায় শেষের পথে। প্রকল্পটি শেষ হলে নগরীর জলাবদ্ধতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। তবে, প্রকল্পের বাহিরে থাকা খালগুলোও খনন করতে হবে এবং সংস্কারের পর রক্ষণাবেক্ষণে জোর দিতে হবে।

জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে পাম্প ও স্লুইসগেট স্থাপন করলেই হবে না, এগুলোর কার্যকর পরিচালনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। সামপ্রতিক বন্যায় সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে মানুষ ও যানবাহনের আশ্রয়ের উপযোগী উঁচু জায়গার সংকট দেখা গেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত এক কিলোমিটার রাস্তা তুলনামূলক উঁচু করে নির্মাণের প্রস্তাব দেন তিনি। তার মতে, এ ধরনের অবকাঠামো বন্যার সময় মানুষ ও গবাদিপশুর আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী হেলিকপ্টার অবতরণ এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সুযোগও রাখা যেতে পারে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে স্লুইসগেট ও রেগুলেটর পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরের দুপাশে অন্তত দুটি সংযোগকারী ‘ক্রস খাল’ নির্মাণের প্রস্তাব দেন তিনি। বলেন, মহেশখাল সমপ্রসারণসহ এ ধরনের খাল নির্মাণ ও সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়তে পারে। পাশাপাশি নৌ চলাচলের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে। খালের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া রোধে ভবিষ্যতে সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে আর্চ ব্রিজের নকশা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

Explore More Districts