মানবজাতি চরম পরীক্ষার মুখে: ইউএনজিএ-তে যুদ্ধ, জলবায়ু, বৈষম্য ও এআই নিয়ে আন্তোনিও গুতেরেসের হুঁশিয়ারি – DesheBideshe



নিউ ইয়র্ক, ২২ সেপ্টেম্বর – বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বিভাজন, রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত উৎকর্ষের মাঝে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে বৈশ্বিক নেতাদের সামনে এক ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা দিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

তিনি স্পষ্ট জানান—যুদ্ধ ও শান্তি, চরম বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)—এই চারটি চ্যালেঞ্জ এখন গোটা মানবজাতির অস্তিত্ব ও ক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের সদর দফতরে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া উদ্বোধনী ভাষণে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।

বদলে যাচ্ছে বিশ্ব ক্ষমতার ধরন

গুতেরেস তার ভাষণে উল্লেখ করেন, বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন পরাশক্তির উত্থান, শক্তিশালী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিতে এআই ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্যবহার এই পরিবর্তনের মূল নিয়ামক হয়ে উঠেছে।

বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে গুতেরেস: “সবচেয়ে বড় ক্ষমতা অন্য দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তারের ক্ষমতা নয়। সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হলো এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষমতা, যা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য কার্যকর হবে।”

বৈশ্বিক সংঘাত ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন

বিভিন্ন দেশের চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে মহাসচিব বলেন:

গাজা ও ফিলিস্তিন: গাজায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) আদেশ মেনে চলার জোর আহ্বান জানান তিনি। একই সাথে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বেআইনি বসতি স্থাপন ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ (Two-State Solution)-কে চিরতরে নস্যাৎ করছে বলে হুঁশিয়ার করেন।

ইউক্রেন ও অন্যান্য অঞ্চল: ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলাকে জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দেন। পাশাপাশি সুদান ও মিয়ানমারে তথাকথিত ‘কম মাত্রার যুদ্ধবিরতি’র নামে বেসামরিক মানুষের ওপর চলা নিরবচ্ছিন্ন অত্যাচারের তীব্র নিন্দা জানান।

নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার কোনো স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকাকে “ঐতিহাসিক অন্যায় ও সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য” বলে আখ্যা দিয়ে জরুরি প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি জানান।

এআই ও জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত: মানবতা কোথায়?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও সামরিকীকরণের ওপর কঠোর নজরদারির তাগিদ দেন মহাসচিব। তিনি কঠোর কণ্ঠে বলেন, “জীবন বা মৃত্যুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কখনোই কোনো যন্ত্র বা অ্যালগরিদমের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এআই নিয়ন্ত্রণে বাধ্যবাধকতামূলক বৈশ্বিক ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।”

বৈশ্বিক বৈষম্য ও জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সাফল্য

বিশ্বজুড়ে বৈষম্য কমাতে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য দ্রুত ঋণমুক্তি, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকের সংস্কার ও আইএমএফের পুনর্গঠনের আহ্বান জানান গুতেরেস।

তবে বক্তব্যের শেষে জাতিসংঘের একটি ঐতিহাসিক মাইলফলকের কথা ঘোষণা করেন তিনি—জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শীর্ষ নেতৃত্ব, সদর দপ্তরের কর্মী ও পেশাগত পদগুলোতে শতভাগ লিঙ্গসমতা (Gender Parity) অর্জিত হয়েছে।

“সমতা কোনো দূরবর্তী স্বপ্ন নয়, এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত,”—ভাষণ শেষ করে এই বার্তাই পৌঁছে দেন বিশ্বমঞ্চে।

এনএন/ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Explore More Districts