বাংলাদেশ-ভারত বিদ্যুৎ ইস্যু: চার্জ, চীনের প্রকল্প ও ‘১২৭% বেশি দাম’—আসলে পুরো ঘটনা কী?



5 min read

১৭৮ বার পড়া হয়েছে

ভারত-চীন-বিদ্যুৎ: নতুন বিতর্কে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে ঘিরে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ভারত ও চীন। সম্প্রতি ভারত সীমান্তপারের বিদ্যুৎ বাণিজ্যে একটি অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ করার পর বাংলাদেশ বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ জোরদার করছে। এরই মধ্যে ঢাকার আমিনবাজারে চীনের সহায়তায় একটি বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাবি উঠেছে—ভারতের সামান্য চার্জ বৃদ্ধির প্রতিবাদে বাংলাদেশ নাকি ১২৭ শতাংশ বেশি দামে চীনা বিদ্যুৎ কিনছে।

কিন্তু বাস্তব চিত্র কি এতটাই সরল? এই প্রতিবেদনে পুরো বিষয়টি অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং রাজনৈতিক—তিনটি দিক থেকে বিশ্লেষণ করা হলো।

কেন শুরু হলো এই বিতর্ক?

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সীমান্তপারের এই বিদ্যুৎ আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়।

ভারতের বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক কমিশন (CERC) আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যে Settlement Nodal Agency (SNA) নামে একটি সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ করে। প্রথমে এই চার্জ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ০.০১ ভারতীয় রুপি নির্ধারণ করা হয়।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এই চার্জ কমানোর অনুরোধ জানালে ভারত পরে সেটি অর্ধেকে নামিয়ে ০.০০৫ রুপি প্রতি ইউনিট করে।

অর্থাৎ শুরুতে চার্জ বাড়ানো হলেও পরে তা কমানো হয়েছে।

SNA চার্জ কী? এটি কি বিদ্যুতের দাম?

এখানেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

SNA চার্জ মূল বিদ্যুতের দাম নয়। এটি সীমান্তপারের বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিচালনার প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত ব্যয়।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • বিদ্যুৎ গ্রিড পরিচালনা।
  • বিদ্যুৎ সরবরাহের সময়সূচি নির্ধারণ।
  • হিসাব ও আর্থিক নিষ্পত্তি।
  • প্রযুক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয়।

অর্থাৎ এটি বিদ্যুতের মূল ইউনিট মূল্যের বাইরে একটি পরিষেবা ব্যয়।
বাংলাদেশ কেন বিকল্প প্রকল্পে যাচ্ছে?

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকট শুধু বিদ্যুতের অভাবের কারণে নয়, জ্বালানি সংকটের কারণেও।

দেশের বড় অংশের বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর কেন্দ্র থেকে। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

এই পরিস্থিতিতে সরকার বিকল্প জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য প্রকল্পে গুরুত্ব দিচ্ছে।

আমিনবাজার প্রকল্পটি আসলে কী?

এই প্রকল্পকে অনেক জায়গায় “চীনের বিদ্যুৎ” বলা হলেও বাস্তবে এটি বাংলাদেশের ভেতরে নির্মিত একটি Waste-to-Energy বা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প।

প্রকল্পের মূল তথ্য:

বিষয়

তথ্য

অবস্থান

আমিনবাজার, ঢাকা

উৎপাদন ক্ষমতা

৪২ মেগাওয়াট

প্রযুক্তি

পৌর বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ

বাস্তবায়নকারী

China Machinery Engineering Corporation (CMEC)

সম্ভাব্য চালু

২০২৮ সালের আগস্ট–সেপ্টেম্বর

পরিচালনা করবে

উত্তর ঢাকা সিটি কর্পোরেশন

এই প্রকল্পে প্রতিদিন শহরের বিপুল পরিমাণ আবর্জনা প্রক্রিয়াজাত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। পাশাপাশি জৈব সার উৎপাদনেরও পরিকল্পনা রয়েছে।

কেন এই বিদ্যুতের দাম বেশি?

প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী এই প্রকল্প থেকে বিদ্যুতের সম্ভাব্য দাম প্রায় ২৫ টাকা প্রতি ইউনিট।

অন্যদিকে গত অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের গড় দাম ছিল প্রায় ১১ টাকা প্রতি ইউনিট।

এই দুই সংখ্যা থেকেই ১২৭ শতাংশ বেশি দামের হিসাব করা হয়েছে।

কিন্তু এই তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে

ভারতের বিদ্যুৎ-

  • আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ আমদানি।
  • হাজার মেগাওয়াটের বড় পরিসরের সরবরাহ।
  • জাতীয় গ্রিডে সরাসরি যুক্ত।

আমিনবাজার প্রকল্প

  • বাংলাদেশের ভেতরে উৎপাদিত বিদ্যুৎ।
  • মাত্র ৪২ মেগাওয়াট।
  • বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচও অন্তর্ভুক্ত।

তাই দুটি ভিন্ন ধরনের প্রকল্পের ইউনিট মূল্য সরাসরি তুলনা করলে পুরো অর্থনৈতিক বাস্তবতা বোঝা যায় না।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এত ব্যয়বহুল কেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে এর কয়েকটি কারণ রয়েছে।

১. বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ

শহরের আবর্জনা সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাত করতে বড় ব্যয় হয়।

২. পরিবেশ সুরক্ষা

ধোঁয়া, ছাই ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়।

৩. ছোট উৎপাদন ক্ষমতা

মাত্র ৪২ মেগাওয়াটের প্রকল্প হওয়ায় প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি।

এই প্রকল্প কি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকট সমাধান করবে?

সংক্ষিপ্ত উত্তর—না।

তুলনা দেখুন

উৎস

উৎপাদন/সরবরাহ

ভারত থেকে আমদানি

প্রায় ২,৬৫৬ মেগাওয়াট

আমিনবাজার প্রকল্প

৪২ মেগাওয়াট

অর্থাৎ ভারতের কাছ থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ আসে, তার খুব ছোট একটি অংশের সমান বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এই প্রকল্প।

এটি জাতীয় বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান নয়, বরং একটি সহায়ক প্রকল্প।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের বড় কারণ কী?

বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত কয়েকটি সমস্যার মুখোমুখি।

প্রধান কারণ

  • গ্যাস সরবরাহ ঘাটতি।
  • এলএনজি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি।
  • জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য ওঠানামা।
  • উৎপাদন কেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার না হওয়া।

ফলে কিছু এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

ভারত থেকে বাংলাদেশ কত বিদ্যুৎ আমদানি করে?

সরকারি তথ্য অনুযায়ী—

  • দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৫–১৬ শতাংশ ভারত থেকে আসে।
  • একাধিক আন্তঃসীমান্ত ট্রান্সমিশন লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়।
  • পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা থেকেও বিদ্যুৎ আসে।

এই বিদ্যুৎ বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে সরাসরি যুক্ত থাকে।

বাংলাদেশ কি ভারত থেকে বিদ্যুৎ কেনা বন্ধ করছে?

এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।

বর্তমান তথ্য অনুযায়ী—

  • ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি অব্যাহত রয়েছে।
  • বিদ্যমান চুক্তি পুরোপুরি বাতিল হয়নি।
  • পাশাপাশি নতুন স্থানীয় বিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ “ভারতের বিদ্যুৎ বাদ দিয়ে পুরো চীনের বিদ্যুৎ নেওয়া হচ্ছে”—এমন দাবি বাস্তব তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না।

রাজনৈতিক দিক: ভারত-চীন সম্পর্ক কি প্রভাব ফেলছে?

এই বিতর্কের সঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষণও যুক্ত হয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, বাংলাদেশ একই সঙ্গে চীন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে।

ভারত এটিকে আঞ্চলিক কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে পর্যবেক্ষণ করছে।

তবে এসব বিশ্লেষণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ; সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে সবকিছু নিশ্চিত নয়।

‘ইসলামি নেটো’ নিয়ে কী আলোচনা?

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে হওয়া একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিকে কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম “ইসলামিক ন্যাটো” নামে উল্লেখ করেছে।

বাংলাদেশের কয়েকজন মন্ত্রী জানিয়েছেন—

বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা চলছে।

জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটে যোগ দিয়েছে—এমন নিশ্চিত ঘোষণা এখনো পাওয়া যায়নি। 

ভারতের প্রতিক্রিয়া কী?

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন সব আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহ তারা পর্যবেক্ষণ করছে।

তবে বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে সরাসরি কোনো অভিযোগ বা নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

তথ্য যাচাই: কোনটি দাবি, কোনটি বাস্তবতা?

আলোচিত দাবি বিশ্লেষণ
ভারত বিদ্যুতের দাম অনেক বাড়িয়েছে। মূল বিদ্যুতের দাম নয়; SNA নামে একটি অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ আরোপ করা হয়েছিল, পরে তা কমানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ভারতের বদলে চীনের বিদ্যুৎ নিচ্ছে। চীনের সহায়তায় বাংলাদেশে একটি স্থানীয় বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। এটি ভারতের আমদানির সমপর্যায়ের বিকল্প নয়।
চীনের বিদ্যুৎ ১২৭ শতাংশ বেশি দামি। ১১ টাকা ও ২৫ টাকার তুলনা থেকে এই হিসাব এসেছে। তবে দুটি ভিন্ন ধরনের প্রকল্পের ইউনিট মূল্য তুলনা করা হয়েছে।
৪২ মেগাওয়াট প্রকল্প বিদ্যুৎ সংকট দূর করবে। বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার তুলনায় এটি খুবই ছোট একটি প্রকল্প।
বাংলাদেশ ‘ইসলামি নেটোতে’ যোগ দিয়েছে। এমন আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো নিশ্চিত হয়নি; সরকারি পর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে বক্তব্য এসেছে।

বাংলাদেশ-ভারত বিদ্যুৎ ইস্যুতে আলোচিত “১২৭ শতাংশ বেশি দামে চীনের বিদ্যুৎ” শিরোনামটি একটি নির্দিষ্ট মূল্য তুলনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও, পুরো প্রেক্ষাপট আরও বিস্তৃত। ভারতের SNA চার্জ সীমান্তপারের বিদ্যুৎ বাণিজ্যের একটি পরিষেবা ব্যয়, আর আমিনবাজার প্রকল্প একটি ছোট আকারের বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যার উদ্দেশ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও।

অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং রাজনৈতিক—এই তিনটি দিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, ভারতের বিদ্যুৎ আমদানি এবং চীনের সহায়তায় নির্মিত স্থানীয় প্রকল্প দুটি একই ধরনের উদ্যোগ নয়। ফলে পুরো ঘটনাকে বুঝতে হলে শুধু শিরোনাম নয়, প্রকল্পের ধরন, উৎপাদন ক্ষমতা, ব্যয় কাঠামো এবং কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

Explore More Districts