| ৯ September ২০২৬ Wednesday ১২:০৫:৩১ AM | |
রাহাদ সুমন,বিশেষ প্রতিনিধি:
বরিশালের বানারীপাড়ার আমৃত্যু সংগ্রামী শতবর্ষী নারী মায়া রাণী দাস। যেন কবি জসিম উদ্দিনের কবিতার “কঙ্কাল সার” দেহের সেই আসমানীর প্রতিরূপ। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত জীবিকার সন্ধানে কঙ্কালসার দেহ নিয়ে মায়া রানী দাস ছুটেছেন মানুষের দ্বারে দ্বারে । প্রথম জীবনে কঠোর পরিশ্রম ও কর্মক্ষমতা হারিয়ে শেষ জীবন হাত পেতেছেন মানুষের কাছে। বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার ফুলশ্রী গ্রামের মেয়ে মায়া রাণী দাস ষাটের দশকের শেষ ভাগে একবুক স্বপ্ন নিয়ে ঘাটছড়া বেঁধেছিলেন ঝালকাঠীর কীর্তিপাশা গ্রামের সুরেন্দ্রনাথ দাসের সঙ্গে। শরীক স্বজনরা সম্পত্তি ঠকিয়ে নিঃস্ব করে দেয় সহজ সরল সুরেন্দ্র নাথ দাসকে। নিরূপায় হয়ে তিনি ১৯৬৯ সালে স্ত্রী মায়া রাণী দাসকে নিয়ে জীবন জীবিকার সন্ধানে বানারীপাড়ায় বসতিগড়েন। বানারীপাড়া বন্দর বাজারে সুরেন্দ্রনাথ দাস ( দাস মহাশয়) দিনমজুর ( কুলি) ও মায়া রাণী দাস হোটেল-রেষ্টুরেন্টে পানি সরবরাহের কাজ শুরু করেন। প্রায় চার দশক বন্দর বাজারের হোটেল-রেষ্টুরেন্টে কলসিতে করে পানি সরবরাহ ও বিভিন্ন জনের বাসাবাড়িতে কাজ করেন মায়া রাণী দাস। পানি সরবরাহ করে কলসি প্রতি ২/১ টাকা করে পেতেন। তাতেই চলতো তার জীবন সংসার। কখনও কপালে ভালো খাবার কিংবা দামি শাড়ি জোটেনি তার। অন্যের দেয়া দানের কম দামের শাড়ি পড়ে কেটে গেছে জীবন। থাকতেন পৌর শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে এক জীর্ণশীর্ন ঘরে। সুখ কি জীবনে তা কোনদিন উপলব্দির সুযোগ হয়নি তার। আজীবন কেটেছে দুঃখদারিদ্রে।
১৯৭১ সালে পাক বাহিনী পুড়িয়ে দেয় ঘর:
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনী পৌর শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের তার জীর্ণশীর্ণ সেই বসতঘরটিও পুড়িয়ে দেয়।
জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি ছেলের টিনকাঠের ছোট্ট ঘরে কাটিয়েছেন।
দুঃখগাঁথা জীবন:
প্রায় দুই যুগ আগে প্রাণপ্রিয় স্বামীকে হারান তিনি। দু’মুঠো ভাতের জন্য তার সংগ্রাম আরও কঠিনতর হয়। বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে এক পর্যায় পানি টানার সেই শক্তিটুকুও তিনি হারিয়ে ফেলেন। কর্মক্ষমতা হারিয়ে মায়া রাণী দাস গত এক দশক ধরে বানারীপাড়া বন্দর বাজার ও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মানুষের কাছে হাত পেতে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। সকলের পরিচিতমুখ অশীতিপর এ বৃদ্ধাকে সবাই সহাস্যমুখে সহায়তা করতেন। তার একমাত্র ছেলে দুলাল দাস দিনমজুর। নিজের সংসার চালানোর পরে মাকে খাওয়ানোর সঙ্গতি নেই ছেলের। তাই তো বেঁচে থাকার জন্য অশীতিপর এ নারী জীবনের শেষ বেলায় মানুষের কাছে হাত পেতে চলেছেন। প্রাণঘাতি করোনাকালে তার কষ্টের জীবন : ২০২০ সালের মার্চে প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের কারনে বন্দর বাজার সহ গোটা এলাকা লক ডাউন ও সবাই হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকায় ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অনাহারে-অর্ধাহারে কাটে তার জীবন। এভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে থাকলে কি খাবেন ! এ দুর্ভাবনায় দু’চোখে তার ঘোর অমানিশার অন্ধকার নেমে আসে। ছুটে যান তৎকালীণ ইউএনও শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ্ সাদীদের কাছে। তার প্রতিশ্রুত এক প্যাকেট খাবারের ( চাল,ডাল,তেল ও আলু) আশায় তিনি দুদিন ধরে অপেক্ষা করছিলেন। ইউএনও তাকে কথা দিয়ে ছিলেন পৌর শহরের ৯ নং ওয়ার্ডে তার বাসায় গিয়ে খাবার পৌঁছে দেবেন। সেই থেকে ইউএনও’র আগমনী পথের পানে চাতক পাখির মতো তিনি তাকিয়ে ছিলেন, কিন্তু তার অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছিলো না…… দুচোখে তার ক্লান্তি এলেও খাবার নিয়ে ইউএনও আসছিলেন না।
ক্ষুধার জ্বালায় জ্বলে পুড়ে তৃতীয় দিন (২০২০ সালের ৩১ মার্চ) সাজের বেলায় বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় বেড়িয়েছিলেন খাবারের আশায় । পথের বাঁকে তার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় এ প্রতিবেদকের। হতাশার সুরে মায়া রানী দাস বললেন বাসায় খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দেওয়ার ইউএনও’র প্রতিশ্রুতির সাক্ষী ছিলে তুমি। বলতে পারো কবে পাব সেই খাবারের প্যাকেট……তার প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে সাহায্যের আশ্বাস দেয়া হয় তাকে। এ মানবিক প্রতিবেদনটি তখন ” বানারীপাড়ায় এক প্যাকেট খাবারের আশায় শতবর্ষী মায়া রাণী দাসের অপেক্ষার যেন শেষ নেই…..” শিরোণামে
একটি জাতীয় দৈনিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এ প্রতিবেদকের ব্যক্তিগত আইডিতে প্রকাশ পেলে তোলপাড় শুরু হয়। তৎকালীণ স্থানীয় এমপি মোঃ শাহে আলম
সংরক্ষিত নারী এমপি সৈয়দা রুবিনা আক্তার মীরা,উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব গোলাম ফারুক ও ইউএনও শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ্ সাদীদের পক্ষ থেকে খাবারের প্যাকেট নিয়ে তার বাসায় দৌঁড়ঝাপ শুরু হয়ে যায়।
মৃত্যুতে থেমে যায় অন্যের কাছে পাতা সেই হাত:
দু”মুঠো ভাতের জন্য আজীবন সংগ্রামী প্রায় শতবর্ষী সেই মায়া রাণী দাস গত ২৫ আগস্ট ভোরে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে চিরঘুমে চলে যান। থেমে যায় তার মানুষের কাছে হাত পেতে চলা জীবন সংগ্রাম। মৃত্যুর পরে তার শেষকৃত্যও সম্পন্ন হয় অন্যের সহায়তায়। বানারীপাড়া উপজেলা পুজা উদযাপন পরিষদ ও মহাশ্মশান কমিটির সভাপতি দেবশীষ দাসের মানবিক সহায়তায় মহাশ্মশানে সেইদিন (২৫ আগস্ট) দুপুরে তার শেষকৃত্য সম্পন্নের মধ্যদিয়ে এক সংগ্রামী জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক
| শেয়ার করতে ক্লিক করুন: | Tweet |
