রপ্তানির জন্য ১২১ টনের বেশি পণ্য ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে অস্তিত্ব নেই। কন্টেনারে পণ্য ছিল না। ডিপোতেও কোনো পণ্য ঢোকেনি। কাগজপত্র ও কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডে ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ কেজি পণ্যের ঘোষিত মূল্য ধরা হয় ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৩০৪ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তৎপরতায় ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেডের প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা মূল্যের পাঁচটি সন্দেহজনক রপ্তানি চালান আটক করা হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, কাগজপত্র ও অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানির তথ্য থাকলেও সংশ্লিষ্ট ইনল্যান্ড কন্টেনার ডিপোতে বাস্তবে পণ্যের কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানা গেছে, ৩ সেপ্টেম্বর অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে রপ্তানি চালান যাচাইকালে ভ্যালমন্ট ফ্যাশনস লিমিটেডের পাঁচটি রপ্তানি চালান কাস্টমস গোয়েন্দার নজরে আসে। প্রাথমিক বিশ্লেষণে রপ্তানির গন্তব্য দেশ, পণ্যের প্রকৃতি ও ঘোষিত মোট ওজনের মধ্যে অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হওয়ায় চালানগুলো আটক করে অধিকতর যাচাই শুরু করা হয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ বিশেষ করে জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড ও ডেনমার্ক। এছাড়া আছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক ও রাশিয়ায়ও তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। কিন্তু আলোচ্য পাঁচটি চালানের গন্তব্য হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ফিলিপাইন উল্লেখ করা হয়, যা গোয়েন্দা বিশ্লেষণে অধিকতর যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বন্ডেড প্রতিষ্ঠানটির বিগত এক বছরে আমদানিকৃত কাঁচামালের পরিমাণের তুলনায় ঘোষিত রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি পাওয়া যায়। প্রাথমিক বিশ্লেষণে এ পরিমাণ স্বাভাবিক ইনপুট–আউটপুট কোএফিসিয়েন্টের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রতীয়মান হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দাখিলকৃত বিল অব এঙপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, পণ্যগুলো ইসাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের ইনল্যান্ড কন্টেনার ডিপো থেকে রপ্তানি হওয়ার কথা ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে কাস্টমস গোয়েন্দার কর্মকর্তারা সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট ডিপোতে গিয়ে পণ্যগুলো পরীক্ষণের জন্য উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। কিন্তু ডিপো কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কোনো পণ্য প্রদর্শন করতে পারেনি। বরং সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রপ্তানির জন্য ঘোষিত পণ্যগুলো ডিপোতে প্রবেশ করেনি। পণ্য ডিপোতে প্রবেশ না করা সত্ত্বেও চালানগুলোর কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা কীভাবে সম্পন্ন হলো, সে বিষয়ে ডিপো কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। কাগজে ১,২১,১৭৫ কেজি বা প্রায় ১২১ মেট্রিক টন পণ্যের বিপরীতে প্রায় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকার রপ্তানি দেখানো হলেও সরেজমিনে যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ডিপোতে ঘোষিত পণ্যের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়, পণ্যের বাস্তব অস্তিত্ব ছাড়াই পাঁচটি চালানের বিপরীতে রপ্তানি প্রদর্শনের অপচেষ্টা করা হয়েছিল, যা কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের নজরদারি ও বিশেষ তৎপরতায় প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। তদন্তে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, পণ্য ছাড়াই কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো কীভাবে? বর্তমানে কাস্টমস হাউস, আইসিডি, চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধানে থাকা বিভিন্ন ইনল্যান্ড কন্টেনার ডিপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি হয়। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রপ্তানি পণ্য প্রথমে সংশ্লিষ্ট কন্টেনার ডিপোতে প্রবেশ করে এবং প্রয়োজনীয় কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর রপ্তানি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। কিন্তু আলোচ্য ঘটনায় পণ্য ডিপোতে প্রবেশ না করেই কীভাবে রপ্তানির কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা উদঘাটনে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ডিপোর সংশ্লিষ্টতা এবং পুরো প্রক্রিয়ায় অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য–প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য কাস্টমস ও অন্যান্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

