| ৩ September ২০২৬ Thursday ১:৩৪:২১ PM | |
আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি:

বরগুনায় আমতলী পৌরসভার সৌন্দর্যবর্ধন বিশেষ উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজে অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন দৈনিক কালবেলার আমতলী প্রতিনিধি মো. মনিরুল ইসলাম। এ সময় তার মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, কটূক্তি, হেনস্তা ও হুমকি-ধমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাস্থলে আমতলী পৌরসভার প্রকৌশলী উপস্থিত থাকলেও সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া ব্যক্তিদের নিবৃত্ত করতে তিনি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।
তবে এ বিষয়ে কালবেলায় সংবাদ প্রকাশের পর প্রকল্প পরিদর্শন করেন বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিল আহমেদ।
বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় পৌরসভার সামনে নির্মাণাধীন সৌন্দর্যবর্ধন ওয়াকওয়ের ধ্বসে যাওয়া স্থান ও নির্মাণ সামগ্রী পরিদর্শন করেন। এ সময় বরগুনা জেলা প্রশাসক মিছ তাছলিমা আক্তার ও পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক মো. আশরাফুল ইসলাম সহ পৌরসভার প্রকৌশলী কর্মকর্তা ছিলেন।
পৌরসভার প্রকৌশলী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে আমতলী পৌরসভার সৌন্দর্যবর্ধন বিশেষ উন্নয়নমূলক প্রকল্পের আওতায় রাস্তা নির্মাণ, লাইটিং পোস্ট স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রকল্পটির বরাদ্দ ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই মেসার্স ইসলাম ব্রাদার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্মাণকাজের অনুমোদন দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, গত ৩০ আগস্ট দুপুর ২টার দিকে আমতলী পৌরসভার সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ওয়াকওয়ের ঢালাইয়ের সময় রডের চালিসহ বড় একটি অংশ দেবে যায়। একই সময়ে বৃষ্টির মধ্যেই ঢালাইয়ের কাজ চলছিল। এ সংক্রান্ত তথ্য পেয়ে ঘটনাস্থলে যান কালবেলার আমতলী প্রতিনিধি মো. মনিরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী। তারা নির্মাণকাজের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও ভিডিও ধারণ করছিলেন। এ সময় নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন লোক সাংবাদিকদের কাছে এসে ভিডিও ধারণে বাধা দেন।
একপর্যায়ে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজসহ মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে ব্যর্থ হয়ে তারা সাংবাদিকদের কটূক্তি ও হেনস্তা করেন এবং হুমকি-ধমকি দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যেতে বাধ্য করেন বলে অভিযোগ করেন উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা।
এদিকে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ও নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছে। প্রকল্পের আওতায় আমতলী পৌরসভার সামনে লেকে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ভাসমান ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া পোস্ট অফিস থেকে ফেরিঘাট মহাসড়ক সংযোগ সড়ক পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের ও ১০ ফুট প্রস্থের রাস্তা এবং আনিস তালুকদারের লেপ-তোষকের দোকান থেকে আক্রাবাড়ি মন্দির পর্যন্ত ১৬২ মিটার দৈর্ঘ্যের ও ১০ ফুট প্রস্থের সৌন্দর্যবর্ধন রাস্তা নির্মাণের কথা রয়েছে। পাশাপাশি রোড প্রটেকশনের জন্য ১৫০টি উন্নতমানের লাইটিং পোস্ট স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকল্পের কাজ চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। কাজ শুরুর প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত প্রকল্পের ৩০ শতাংশ কাজও শেষ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। একই সঙ্গে প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন বিভিন্ন কাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া গেছে। নির্মাণাধীন সড়কের কাজে ব্যবহৃত ম্যাগাডামে নিম্নমানের ইটের সঙ্গে পলেস্তারের গুঁড়া ও ডাস্ট মেশানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সড়কের এজিংয়ে ব্যবহৃত কংক্রিটের সলিড ব্লকও নিম্নমানের হওয়ায় নির্মাণকাজ চলার সময়ই অনেক জায়গায় ফেটে যেতে দেখা গেছে। এছাড়া সড়কে বিছানো ইন্টারলকিং পেভার ব্লকের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় মোমেন আকন অভিযোগ করে বলেন, ‘দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী নির্মাণকাজে মানসম্মত প্রথম শ্রেণির ইটের খোয়া, উন্নতমানের ব্লক ও ইন্টারলকিং ব্লক ব্যবহারের কথা। কিন্তু বাস্তবে পরিত্যক্ত ভবনের পচা ও নিম্নমানের ইটের খোয়া ব্যবহার করে কাজ করা হচ্ছে। পৌর কর্তৃপক্ষের চোখের সামনেই এসব নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।’
তবে প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইসলাম ব্রাদার্সের প্রতিনিধি নোমান বলেন, ‘সেল্টারিংয়ের কাঠ নস্ট হওয়ায় ঢালাই দেবে গেছে। কাজটি বন্ধ রাখা হয়েছে।’
বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মো.খলিল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনা জেনে সরেজমিনে এসেছি, জেলা প্রশাসক রয়েছেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ের সাড়ে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণকাজে কনক্রিট সেম্পল নেওয়া হয়েছে। বুয়েটে পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। তবে দৃশ্যমান অনিয়ম যেটি দেখা গেছে- স্টিল সেল্টারিংয়ের পরিবর্তে বাশ ও কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে; যার জন্য দেবে গেছে বলে ধারণা করা হয়। এ কাজে ঠিকাদার চুক্তি অনুযায়ী নিয়ম মেনে করেনি।’
সাংবাদিক হেনস্তার বিষয়ে দুঃখপ্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘উন্নয়নমূলক কাজে দেশের যে কোনো নাগরিক তথ্য চাইতে পারে। তথ্য সংগ্রহে যদি কোনো সাংবাদিক হেনস্থা হয়ে থাকেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা রয়েছে এ বিষয়ে অভিযোগ করতে পারেন।’
সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক
| শেয়ার করতে ক্লিক করুন: | Tweet |
