| ১১ August ২০২৬ Tuesday ৪:৩৩:০৯ PM | |
- খাসজমির মালিক পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনরাও
- ভিপি জমির নামজারি করান মোটা অঙ্কের ঘুষে
ভোলা প্রতিনিধি:

জালিয়াতির মাধ্যমে খাসজমি দখলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ভোলা পৌর ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মুসফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে। পাঁচ বছরের শিশুসন্তানকে ২৫ বছরের যুবক বানিয়ে, এমনকি তাকে বিবাহিত দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন একের পর এক সরকারি জমি।
এ ছাড়া নিজের ও বাবার বয়স একই বানিয়ে, স্ত্রীর নাম বদলে এবং বাবার পরিচয় গোপন করে নামে-বেনামে চরফ্যাশনের বিভিন্ন মৌজায় বাগিয়ে নিয়েছেন ৩০ একরেরও বেশি খাসজমি। পরে স্থানীয়দের কাছে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে এসব জমি বিক্রিও করেছেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছ, শুধু জালিয়াতির মাধ্যমে খাসজমি বন্দোবস্ত নিয়েই ক্ষান্ত হননি মুসফিকুর। সরকারি ‘ক’ তালিকাভুক্ত অনেক ভিপি জমি মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে জালিয়াতির মাধ্যমে নামজারির মতো গুরুতর অভিযোগ এই ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় ২০২৫ সালে উপজেলার চর নীলকমল মৌজার ২৭ একর ভিপি জমির আটটি নামজারি বাতিল করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গত শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার চর মানিকা ও নুরাবাদসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে সরেজমিনে গেলে সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মুসফিকুর রহমানের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি অফিসে চাকরির সুযোগে চরফ্যাশনের বিভিন্ন মৌজায় নামে-বেনামে দেড় একর করে প্রায় ৩০-৩৫টি খাসজমি বন্দোবস্ত নেন মুসফিকুর। কৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা অনুযায়ী বন্দোবস্তের জমি বিক্রয়, দান বা অন্য কোনো উপায়ে হাতবদল নিষিদ্ধ থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ওই জমি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি করেছেন তিনি।
মুসফিকের বন্দোবস্ত নেওয়া জমির মধ্যে ছয়টি জমির কাগজপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, মুসফিকুর ২০০১ সালে নিজেকে নদীভাঙনে ভূমিহীন দাবি করে চরফ্যাশনের দক্ষিণ চর আইচায় দেড় একর জমি বন্দোবস্ত নেন। ২০০৪ সালে তার ছেলে মাহফুজুর রহমানের নামে চর কচ্ছপিয়ায় দেড় একর জমি বন্দোবস্ত নেন। খাসজমি নিতে তিনি পাঁচ বছর বয়সী ছেলেকে ২৫ বছর ও ২০ বছর বয়সী স্ত্রী এবং দুই বছর বয়সী এক ছেলে দেখিয়েছেন।
একই সালে ছেলের ডাক নাম মো. রিমনের নামে দেড় একর, ভগ্নিপতি আবুল কাশেমের নামে দেড় একর, নিজ নাম পরিবর্তন করে মো. মোশারেফের নামে দেড় একর, তার স্কুলশিক্ষক বাবা মো. মফিজুর রহমানের নামে দেড় একর জমি বন্দোবস্ত নেন। সরকারি জমি নিতে গিয়ে তিনি নিজের বয়স ও বাবার বয়স একই দেখিয়েছেন।প্রত্যেক বন্দোবস্তের আবেদনে স্থায়ী ঠিকানা দৌলতখান উল্লেখ করেছেন। নদীভাঙনের কারণে ভূমিহীন দেখিয়ে তাদের নামে খাস জমি হাতিয়ে নেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সিরাজের অভিযোগ, মুসফিকুর তার ছেলে মাহফুজুর রহমানের নামে খাসজমি বন্দোবস্ত নিয়ে তার বাড়ির মধ্যে ২৬ শতাংশ জমি জোর করে দখল করেছেন। জমিসংক্রান্ত বিষয়ে মুসফিকের করা অভিযোগে বেশ কয়েকবার পুলিশ তাকে (সিরাজ) থানায় নিয়ে আটকে রাখে।
এদিকে ১৯৮৪ সালে ডায়োসিসন ট্রাস্ট অ্যাসোসিয়েশন চার্চ অব বাংলাদেশ চর কচ্ছপিয়া মৌজায় প্রায় চার একর জমিতে স্থানীয় অসহায় ভূমিহীন প্রায় ৫৪টি পরিবারকে পুনর্বাসন করে। সেই থেকে ওই পরিবারগুলো সেখানে বসবাস করে আসছেন। ওই জমির মধ্যেও মুসফিকের ছেলের নামে নেওয়া বন্দোবস্ত জমি রয়েছে বলে তাদরেকে উৎখাতের চেষ্টা করেন মুসফিক।
চার্চ অব বাংলাদেশের স্থানীয় প্রতিনিধি মো. ছায়েদ ফরাজী বলেন, ১৯৮৪ সাল থেকে চার্চ অব বাংলাদেশের দেওয়া জমিতে তারা বসবাস করে আসছেন। ২০১৫ সালের পর তহশিলদার মুসফিক জমি দাবি করেন। এখনো মুসিফকের পক্ষ হয়ে স্থানীয় কিছু লোক এসে জমি দাবি করেন।
স্থানীয় হানিফ বয়াতী বলেন, তারা ভূমিহীন অসহায় পরিবার হওয়ায় র্দীঘদিন ধরে সরকারি খাসজমিতে বসবাস করে আসছেন, তবে তাদের নামে কোনো কাগজপত্র নেই। এক দশক আগে তহশিলদার মুসফিক জমিটি তার ছেলে মাহফুজের নামে বন্দোবস্ত নেন বলে তাদের কাছে ৩২ শতংশ জমি বিক্রি করেছেন। তাদেরকে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে দুই লাখ টাকা নিয়ে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে এই জমি কিনতে বাধ্য করেছেন।
একই ঘটনার শিকার হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা জিয়াউর রহমান আখন, মো. রফিকুল ইসলাম, হানিফ বয়াতি ও মো. মোজ্জাল।
ভিপি জমির নামজারি নিয়ে ঘুষবাণিজ্য
শুধু খাসজমি বন্দোবস্তের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মুসফিকুর রহমান। চরফ্যাশনের নুরাবাদ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনের সময় মোটা অঙ্কেন ঘুষের বিনিময়ে জীবিত ও মৃত ব্যক্তির নামে নামজারি করেছেন বহু সরকারি ‘ক’ তালিকাভুক্ত ভিপি জমি ।
এসব নামজরির মধ্যে আটটি নামজারি পর্যালোচনা করতে গিয়ে জানা গেছে, অনলাইনে জমির কাগজপত্র ও আবেদনকারীদের এনআইডি দেওয়া হয়নি। এর পরও নামজারি অনুমোদন করেন তখনকার চরফ্যাশন উপজেলার সহকারী কমশিনার (ভূমি) মোহাম্মদ সালেক মূহিদ।
আবেদনকারীদের মধ্যে নীলকমল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়র্ডের বাসিন্দা তোফায়েল আহমেদ ও তার ভাতিজা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, তারা দালালের মাধ্যমে আটজনের নামে ১১ একর জমির নামজারির আবেদন করেন। ভূমি সহকারী কর্মকর্তার কক্ষে থাকা আবু সাইদ নামের একজনকে নামজারির জন্য পাঁচ লাখ টাকা দেন। পরে তারা জমির খাজনা দিতে গিয়ে জানতে পারেন নামজারি বাতিল হয়েছে। কিন্তু দালালের মাধ্যমে দেওয়া পাঁচ লাখ টাকা আর ফেরত পাননি।
কোনো কাগজপত্র ছাড়াই সরকারের বিপুল পরিমাণ সম্পদ মৃত ও জীবিতদের নামে নামজারির প্রমাণ পেলেও মুসফিকুরের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।
তবে অভিযুক্ত ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মুসফিকুর রহমানের দাবি, তিনি চরফ্যাশনে কোনো খাসজমি বন্দোবস্ত নেননি। বন্দোবস্ত নেওয়া জমির কাগজপত্র দেখালে তিনি তাদেরকে চেনেন না বলে দাবি করেন। আর ভিপি জমি নামজারিতে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি দাবি করেন তিনি বলেন, ভুলে নামজারি হওয়ায় পরে সেগুলো বাতিল করা হয়।
চরফ্যাশন উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এমাদুল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, তথ্য গোপন করে সরকারি জমি বন্দোবস্ত নিলে বন্দোবস্ত বাতিলসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে সরকারি ভিপি জমি নামজারির বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি আসার আগে এ নামজারিগুলো হয়েছে। তবে আগের এসিল্যান্ড যাওয়ার সময়ই সেগুলো বাতিলের জন্য আদেশ দিয়ে গেছেন। পরে তিনি যোগ দেওয়ার পর অনলাইন থেকে সেগুলো বাতিল করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোলার জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, কোনো সরকারি কর্মচারীর নিজ ও পরিবারের আত্মীয়-স্বজনদের নামে সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত নেওয়া গুরুতর অন্যায়। কোনো সরকারি কর্মচারী নিজেকে ভূমিহীন বলতে পারবেন না, এটি নীতিমালাবিরোধী। ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মুসফিকের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এ বিষয়ে তদন্ত করে দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক
| শেয়ার করতে ক্লিক করুন: | Tweet |
