পিরোজপুরের আটঘর কুড়িয়ানা: ভাসমান পেয়ারা বাজার যেন সবুজ-হলুদের ক্যানভাস

পিরোজপুরের আটঘর কুড়িয়ানা: ভাসমান পেয়ারা বাজার যেন সবুজ-হলুদের ক্যানভাস

২৯ July ২০২৬ Wednesday ১:০৫:০৭ PM

Print this E-mail this


পিরোজপুর প্রতিনিধি:

পিরোজপুরের আটঘর কুড়িয়ানা: ভাসমান পেয়ারা বাজার যেন সবুজ-হলুদের ক্যানভাস

খালজুড়ে ভাসছে সারি সারি নৌকা। এর প্রতিটিতে সাজানো তাজা সবুজ-হলুদ পেয়ারা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে খালের বুকে যেন সবুজ-হলুদের ক্যানভাস ভেসে চলেছে! এমনই দৃশ্যের দেখা মেলে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানায় পেয়ারার ভরা মৌসুমে। সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আটঘর কুড়িয়ানা, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠিসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের খালের বুক চিরে ছোট ছোট নৌকায় পেয়ারা নিয়ে সন্ধ্যা নদীর শাখা আটঘর কুড়িয়ানা খালে নিয়ে আসেন চাষিরা। বর্তমানে দেশের একমাত্র ভাসমান পেয়ারার হাট শুধু স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রই নয়, বরং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছেও একটি অনন্য দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে। এখানকার পেয়ারা আকারে বড় আর সুস্বাদু হওয়ায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পদ্মা সেতু হওয়ার পর নেছারাবাদের পেয়ারার চাহিদা আরও বেড়েছে। এখন কৃষক ভালো মূল্য পাচ্ছেন, ব্যবসায়ী পণ্য দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন। এতে এই ফলের চাষাবাদ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোয় ছড়িয়ে পড়েছে।

ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি পেয়ারার মৌসুমে এ হাটকে কেন্দ্র করে পর্যটকদেরও ঢল নামে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাসমান এই হাটের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। যতই দেখুক না কেন, এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখার তৃষ্ণা যেন মেটে না। দর্শনার্থীরা নৌকা ও ট্রলারে করে পেয়ারা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। এতে একদিকে যেমন বেড়েছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে স্থানীয় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান। রোববার আটঘর কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা হাট ঘুরে দেখা যায়, আশপাশের এলাকা থেকে ছোট ছোট ডিঙিতে পেয়ারাবোঝাই করে বিক্রির জন্য এসেছেন চাষিরা। দরদাম করছেন পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। দরদামে মিলে গেলে প্লাস্টিকের ট্রেতে ওপরে ওঠানো হচ্ছে পেয়ারা। কেউবা টাকা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন নিজ গন্তব্যে। কেউবা পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ফিরছেন। স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্র। এই হাট ঘিরে স্থানীয় হোটেল ও রেস্টুরেন্টগুলো জমজমাট হয়ে উঠেছে। এখানে সরষে ইলিশ, ইলিশভর্তা, চিংড়ি ভুনা, হাঁসের মাংসসহ বেশ কয়েকটি খাবার খুব জনপ্রিয়। 

পেয়ারাচাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, হাট থেকে প্রতিদিন শত শত মন পেয়ারা চলে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। প্রতি মন পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা।

বাগেরহাট থেকে পেয়ারা কিনতে এসেছেন নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমি কচুয়া উপজেলা থেকে আসছি, এই জায়গা দিয়া পেয়ারা কিনে বাজারে বিক্রি করব। এই পেয়ারা বাংলাদেশে আর কোথাও হয় না।’

স্থানীয় পেয়ারা ব্যবসায়ী মোস্তফা হাওলাদার বলেন, এ বছর পেয়ারা একটু কম হয়েছে আবহাওয়া খারাপ হওয়ার কারণে। তবে দাম ভালো। পেয়ারাচাষি অনুপম হালদার বলেন, আমার ১০ বিঘা জমিতে পেয়ারা চাষ হয়। ফজরের আজানের পর বাগানে গিয়ে পেয়ারা পাড়া শুরু করি। পেয়ারা পাড়তে অনেক সময় লাগে। পেয়ারা পাড়া শেষ হইলে নৌকায় বেচতে নিয়ে আসি।

পিরোজপুর থেকে ভাসমান নৌকার হাট দেখতে এসেছেন পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার কিঞ্জাল। তিনি বলেন, প্রতিবছর পেয়ারার মৌসুমে ভাসমান পেয়ারার হাট দেখতে আসি। দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়। ছোট ছোট নৌকায় খালের ভেতর দিয়ে পেয়ারাগুলো যখন নিয়ে আসে, অসাধারণ লাগে। এরকম সৌন্দর্য আর কোথাও দেখা যায় না। 

নেছারাবাদের ইউএনও অমিত দত্ত বলেন, উপজেলার পুরো পর্যটনব্যবস্থা নিয়ে আমরা একটি পরিকল্পনা করেছি। কীভাবে এই পর্যটনকেন্দ্র আরও বেশি সুন্দর করা যায়। কীভাবে পর্যটকদের থাকা এবং খাওয়া এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, এ ব্যাপারেও চিন্তা করা হচ্ছে। এছাড়া বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতেও কাজ করা হচ্ছে। রাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামারবাড়ী) সৌমিত্র সরকার বলেন, পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদে সব থেকে বেশি পেয়ারার চাষ হচ্ছে। জেলায় ৭১০ সেক্টর জমিতে এই ফলের আবাদ হচ্ছে। এর উৎপাদন ৭ হাজার ২১০ মেট্রিক টন। প্রতি মৌসুমে এ পেয়ারার হাটে ২০ কোটি টাকারও বেশি পেয়ারা কেনাবেচা হয়। এখানে একটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা হলে এবং মৌসুমি পেয়ারা সংরক্ষণ করে রাখতে পারলে কৃষক ন্যায্য বাজারমূল্য পাবেন।

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

Explore More Districts