ড. আমানুর আমান
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন শুধু প্রতিনিধি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্য যাচাইয়ের অন্যতম মানদণ্ড। তাই সরকার যখন ঘোষণা দিয়েছে, চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকেই পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—এই নির্বাচন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে?
প্রশ্নটি নতুন নয়। বরং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণেই এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল এর অংশগ্রহণমূলক চরিত্র। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নিবন্ধন ও আইনি জটিলতার কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দলও নির্বাচনের বাইরে ছিল। ফলে নির্বাচনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে নয়, বরং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আলোচনা বেশি হয়েছে।
এখন সেই অভিজ্ঞতার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এই নির্বাচনও কি একই বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি হবে, নাকি নতুন কোনো রাজনৈতিক বার্তা দেবে?
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অস্থির এবং একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন সম্পন্ন হয়। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে রয়েছে। অর্থাৎ সরকার এখন শুধু নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্বেই নয়, গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিকভাবে জবাবদিহির অবস্থানে রয়েছে।
এ কারণেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন বর্তমান সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা। কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা বা পৌরসভার নেতৃত্ব নির্ধারণ করে না; এটি সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক গড়ে তোলে। এখানে ভোটাররা জাতীয় রাজনীতির চেয়ে স্থানীয় উন্নয়ন, জনপ্রতিনিধির গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে এই নির্বাচন জনগণের প্রকৃত মতামত বোঝারও একটি বড় সুযোগ।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনগতভাবে নির্দলীয়। অর্থাৎ ব্যালটে রাজনৈতিক দলের প্রতীক থাকে না। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি পুরোপুরি নির্দলীয় থাকে না। প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় ভোটারদের কাছে স্পষ্ট থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক শক্তি, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং কর্মী-সমর্থকদের ভূমিকা নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলে। তাই আইন নির্দলীয় হলেও বাস্তবতা অনেকটাই দলীয়।
এখানেই অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি কোনো রাজনৈতিক শক্তি আইনগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না পায়, অথবা বাস্তবে অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরি না হয়, তাহলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। আবার অন্যদিকে, যদি কোনো দলের বিরুদ্ধে আদালতের বিচার, আইনগত নিষেধাজ্ঞা বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশনেরও সেই আইনি কাঠামোর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি আইন, বিচারপ্রক্রিয়া এবং সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এই বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন ইতোমধ্যে জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনে যোগ্যতার শর্ত পূরণ করলে ব্যক্তি হিসেবে যে কেউ নির্বাচন করতে পারবেন; রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনার বিষয় নয়। একই সঙ্গে সরকারও এখন পর্যন্ত এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি, যাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আলাদা রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এই অবস্থান বজায় থাকলে অন্তত নীতিগতভাবে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু আইনি সুযোগ থাকাই যথেষ্ট নয়। একটি নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে রাজনৈতিক আস্থা, নিরাপত্তা, সমান সুযোগ এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা। প্রার্থীরা যদি মনে করেন তারা স্বাধীনভাবে প্রচারণা চালাতে পারবেন, ভোটাররা যদি নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন এবং প্রশাসন যদি সবার প্রতি সমান আচরণ করে, তবেই নির্বাচন প্রকৃত অর্থে অংশগ্রহণমূলক হয়ে উঠবে।
আরও একটি বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে জাতীয় রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিস্থাপক হিসেবে দেখা উচিত নয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের দৈনন্দিন সেবা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় উন্নয়নকে গতিশীল করা। তাই এই নির্বাচনকে যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে স্থানীয় শাসনব্যবস্থা।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাস বলছে, একতরফা বা সীমিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন দীর্ঘমেয়াদে কোনো রাজনৈতিক পক্ষের জন্যই স্থায়ী সুবিধা বয়ে আনে না। ক্ষমতায় থাকা দল যেমন একসময় বিরোধী দলে যায়, তেমনি বিরোধী দলও একসময় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়। তাই যে নীতি আজ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়, ভবিষ্যতে সেটিই অন্য কারও জন্য নজির হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ কারণেই নির্বাচনব্যবস্থার ন্যায্যতা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকা প্রয়োজন।
বর্তমান সরকারের জন্যও এটি একটি সুযোগ। জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক ও গ্রহণযোগ্যভাবে আয়োজনের মাধ্যমে সেই আস্থার ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব। আবার যদি নির্বাচন নিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন ওঠে, তাহলে রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
শেষ পর্যন্ত একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—গণতন্ত্রের শক্তি কেবল বিজয়ীর সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগে। নির্বাচন তখনই অর্থবহ হয়, যখন জনগণ বিশ্বাস করে তাদের সামনে বাস্তব বিকল্প রয়েছে এবং তাদের ভোটই ফল নির্ধারণ করবে।
ডিসেম্বরে শুরু হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন তাই শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের আরেকটি আয়োজন নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই নির্বাচন প্রমাণ করতে পারে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও একটি রাষ্ট্র কীভাবে অংশগ্রহণ, প্রতিযোগিতা এবং আইনের শাসনের সমন্বয়ে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। আর সেটিই হবে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জন।
ড. আমার আমান, সম্পাদক প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস



