ঘুম

ঘুম

হাওরের পাড়ে লুনা দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে দেখে বলল, ‘আপনি চলে যাবেন। আমি জানি। এটাও জানি কোথায় যাবেন। ঠিকই আছে। আমি তো ওই জগতেও আছি। ওই আমিটা ভাগ্যবতী, এই আমিটা না। এ–ই যা তফাত। ওকে বলবেন, তার কপালে যে সংসারটা জুটেছে, সেটার জন্য অন্য এক জগতে একজন সারা জীবন অপেক্ষা করে বসে আছে। সে যেন জীবনটা কোনোভাবেই অবহেলা না করে।’

তারপর গলা নামিয়ে বলল, ‘যাওয়ার আগে একটা মিথ্যা বলে যান। বলেন যে এই জগতেই থাকবেন।’

আমি বললাম, ‘থাকব।’

লুনা হাসল। পূর্ণ, উজ্জ্বল হাসি।

ঢাকায় সেই রাতে টুনটুনির জ্বর কমেছে। সে আমার হাত ধরে শুয়ে ছিল। ভোর চারটার দিকে ঘুম ভেঙে বলল, ‘বাবা, তুমি ঘুমাও না কেন?’

‘ঘুমালে একটা জিনিস হারিয়ে যাবে মা।’

সে ঘুমজড়ানো গলায় বলল, ‘ঘুমিয়ে ওঠার পর যেটা হারিয়ে যায়, সেটা স্বপ্ন। স্কুলের মিস বলেছেন। স্বপ্ন হারালে তো সমস্যা নেই। ঘুমাও বাবা।’

সাত বছরের মেয়ের কাছে আমি দর্শনের পাঠ নিলাম। এক পাশে আমার মেয়ে, আমার স্ত্রী; আরেক পাশে আমার মা, আর সেই মানুষটা, যে সবে আমাকে খুঁজে পেয়েছে। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে অনেক পরীক্ষা দেন। সবচেয়ে বড় পরীক্ষার নাম বিকল্প ভাবনা, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া, কোনটা করলে কী হতো আর কী হতে পারত, এই নিয়ে দোটানা।

আমি জেগে উঠলাম।

অভ্যাসমতো চোখ খোলার আগে বাঁ হাত তুললাম, আঙুল নাড়লাম। তারপর চোখ খুলে ছাদ দেখলাম।

কোন ছাদটা দেখলাম, তা বলব না। বললে গল্পটা শেষ হয়ে যাবে। কিছু গল্প শেষ করতে নেই।

শুধু এটুকু বলতে পারি, ঘুম ভেঙে প্রথম যে জিনিসটা টের পেলাম, তা হলো শূন্যতা। কিছু একটা নেই। কী নেই, মনে করতে পারলাম না। মুছে যাওয়া জগতের স্মৃতিও কি ধীরে ধীরে মুছে যায়? ডাক্তাররা এই কথাটা বলেননি।

বালিশের নিচে ডায়েরিটা ছিল। কী রঙের ডায়েরি, সেটাও বলব না। ডায়েরির শেষ পাতায় ১৩ বছরের হিসাব আর লেখালেখি। আমি সেদিন থেকে ডায়েরিতে কোনো লেখালেখি বন্ধ করে দিয়েছি।

এরপর বহু বছর কেটে গেছে। আমার জীবন এখন একটাই। সবার মতো। রাতে ঘুমাই। স্বপ্ন দেখি না। সকালে উঠি। লোকে বলে আমি সুখী মানুষ। কথাটা সম্ভবত সত্যি। শুধু মাঝেমধ্যে অকারণে বুকের ভেতরটা খালি লাগে। আমি ভেবে পাই না কেন। আমার তো সবই আছে।

পরে বুঝেছি, এই খালি ভাবটা শুধু আমার না। প্রত্যেকেরই হয়তো বুকের ভেতরে কিছু তালা দেওয়া খালি ঘর থাকে। ঘরগুলো কিসের জন্য খালি পড়ে আছে, মানুষ নিজেও জানে না। হয়তো প্রত্যেকেরই কোথাও না কোথাও একটা মুছে যাওয়া জগৎ আছে। একটা না–বলা ‘মা’ ডাক, একটা না–হওয়া সংসার, একটা না–ধরা হাত, একটা অসমাপ্ত গল্প। কিছু হারালে মানুষ কাঁদে। কিন্তু কী হারিয়েছে ভুলে গেলে মানুষ কাঁদতেও পারে না। শুধু শূন্য হয়ে থাকে। কান্নার চেয়ে শূন্যতা অনেক ভারী।

তবে তিনটা ঘটনা আছে, যার ব্যাখ্যা আমি আজও পাইনি।

প্রথম ঘটনা। খুব বৃষ্টির রাতে আমি এমন একটা ছাদের শব্দ শুনি, যে ছাদ আমার বাড়িতে নেই। কোন ছাদের শব্দ, সেটা বললেই আপনি বুঝে ফেলবেন আমি কোন জগতে জেগেছিলাম। তাই বলব না। প্রথম প্রথম ভাবতাম শব্দটা আমার কানের ভুল। ভুলটা ভাঙল এক রাতে, যখন আমার পাশে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটা আধো ঘুমে বিড়বিড় করে বলল, ‘আজ বৃষ্টির শব্দটা কেমন অন্য রকম লাগছে, না?’

দ্বিতীয় ঘটনা। বছরে একটা দিন আছে, যেদিন আমার ঘুম ভাঙে সেই শূন্যতার গ্রাসের মধ্যে। স্বপ্ন না, দুঃস্বপ্ন না, কিছুই না। শুধু ঘুম ভেঙে টের পাই বুকের ভেতর পাথর, আর বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে খুব চেনা একটা গন্ধ। আমি ক্যালেন্ডার দেখেছি, পুরোনো ডায়েরি ঘেঁটেছি। এই তারিখে আমার জীবনে কোনো দিন কিছু ঘটেনি। কারও জন্ম না, কারও মৃত্যু না, কিছুই না। আমার মনে পড়ে না কেন এই রাতটা এমন।

তৃতীয় ঘটনা এবং এটাই সবচেয়ে অদ্ভুত। প্রায় রাতেই চোখ বন্ধ করার ঠিক পরে মনে হয়, জগৎ বদলানোর দরজাটা এখনো আছে। মুছে যায়নি। আমি কেবল ভুলে গেছি ওটা কীভাবে খুলতে হয়। কোনো কোনো রাতে ওপাশ থেকে টোকা পড়ে। মৃদু, ধৈর্যশীল টোকা। বছরের পর বছর ধরে আমি একটা জিনিস লক্ষ করেছি। টোকাটা কখনো দুঃখের রাতে পড়ে না। পড়ে সুখের রাতে, যে রাতে আমি প্রাণ খুলে হেসেছি, যে রাতে খেতে বসে মনে হয়েছে জীবনটা আসলে সুন্দর, ঠিক সেই রাতেই ওপাশ থেকে কেউ দরজায় টোকা দেয়। যেন মনে করিয়ে দিতে চায়, এই হাসিটার দাম কেউ একজন দিয়ে গেছে। কিংবা কে জানে, হয়তো ওপাশের মানুষগুলো টের পায় যে আমি তাদের ভুলে যাচ্ছি। ডাক্তাররা বলেছিলেন, মুছে যাওয়া ব্যথাহীন, ব্যথা শুধু তার যে মনে রাখে। এই কথাটা আমি আজকাল আর বিশ্বাস করি না।

আমি সাড়া দিই না।

সাড়া না দেওয়ার কারণ ভয়। তবে যে ভয়টা আপনি ভাবছেন, সেটা না। আমার ভয় হলো, দরজা খুললে আমি জানতে পারব ওপাশে কে দাঁড়িয়ে।

যাদের আমি মুছে দিয়েছি তারা, নাকি যে আমাকে মুছে দিয়েছে সে?

Explore More Districts