কাতারের মরুভূমিতে ইতিমধ্যেই ফুটবলের এভারেস্ট জয় করেছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা এবারের বিশ্বকাপে প্রতি পদে পদে বুঝিয়ে দিয়েছে, একবার ট্রফি ছোঁয়া মানেই তাদের ক্ষুধার অবসান ঘটে যাওয়া নয়! বরং কোচ লিওনেল স্কালোনির মতে, টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের এই অবিরাম দৌড়ের আসল জ্বালানি আসছে আলবিসেলেস্তেদের কোটি কোটি ভক্তদের কাছ থেকে।

নিজেদের মুকুট ধরে রাখার আর মাত্র এক ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে সোমবার নিউ জার্সির মেগা ফাইনালে ইউরোপসেরা স্পেনের মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা। মাঠের নামার আগে তাদের কাঁধে শুধু প্রত্যাশার চাপই নেই, আছে এমন এক অন্ধ ভক্তকুলের আবেগঘন সমর্থন, যা পুরো টুর্নামেন্টে তাদের টেনে নিয়ে এসেছে। বিশ্বকাপের আগে অনেকেই ফিসফাস করছিলেন, বিশ্বজয় করে ফেলা একটা দলের ভেতর কি আর সেই আগের মতো জেদ থাকবে? আর্জেন্টিনা তার মোক্ষম জবাব দিয়েছে মাঠেই; স্কালোনি যুগের চিরচেনা সেই অদম্য মানসিকতা দিয়ে বারবার খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তারা।
শনিবার সংবাদ সম্মেলনে এসে ট্যাকটিক্স আর ট্রফির মারপ্যাঁচকে একপাশে সরিয়ে রেখে আর্জেন্টাইন বস বলেন, যখন আপনি নিজের দেশের মানুষকে এভাবে উদযাপন করতে দেখেন, তাদের মুখে হাসি দেখেন, তখন তা আপনার মন ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। টিভির সামনে বোকা জুনিয়র্স আর রিভার প্লেটের (আর্জেন্টিনার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব) সমর্থকরাও একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, এই দৃশ্য আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত না করে পারে?
কোচের এই আবেগের সুরে সুর মিলিয়েছেন দলের ভরসার দেয়াল গোলরক্ষক এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্টিনেজও। তিনি বলেন, আমাদের দেশের ভক্তরা আসলেই পুরো পাগল! অন্য সব দেশের চেয়ে আলাদা। আর্জেন্টিনার এই কনকনে শীতের রাতেও যখন দেখি মানুষ ভোর রাত ২টায় রাস্তায় নেমে উল্লাস করছে, তখন বুকটা ভরে যায়। আমরা এই কাপটা দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য জানপ্রাণ লড়িয়ে দেব। অ্যাস্টন ভিলার এই বাজপাখি স্বীকার করেছেন, চার বছর আগের কাতার বিশ্বকাপের চেয়েও এবারের টুর্নামেন্ট তিনি বেশি উপভোগ করছেন। কারণ সেবার প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে ধাক্কা খাওয়ার ক্ষতটা বড্ড বেশি যন্ত্রণাদায়ক ছিল।
অবশ্য ফাইনালের আগের প্রস্তুতিটা আর্জেন্টিনার মনমতো হয়নি। বৃহস্পতিবার আটলান্টায় ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল জয়ের পর স্পেনের চেয়ে একদিন কম সময় পেয়েছে তারা বিশ্রামের জন্য। স্কালোনি জানালেন, আমাদের অনুশীলনের তেমন সময় নেই। গত রাতে আমরা রাত ১১টায় এসে পৌঁছেছি, আগামীকালও বেশ ব্যস্ততা যাবে। আমি ছেলেদের সাথে কথা বলে দেখব কে কেমন আছে, তবে সবাই লড়ার জন্য প্রস্তুত।
নিউ জার্সির মাঠে এবার দেখা যাবে এক ক্ল্যাসিক ফুটবলীয় যুদ্ধ, আর্জেন্টিনার আগ্রাসন, আবেগ আর লিওনেল মেসির জাদুর বিপরীতে থাকছে স্পেনের সেই নান্দনিক পাসিং ফুটবল, যার মূল কাণ্ডারি ১৯ বছরের বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল। ৩৯ বছর বয়সে এসেও সময়ের চাকা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া জাদুকর মেসির সামনে সুযোগ নিজের রাজকীয় ক্যারিয়ারে আরও একটি রূপকথার অধ্যায় যোগ করার।
মেসিকে নিয়ে স্কালোনির মুগ্ধতা যেন কাটছেই না, ৩৯ বছর বয়সে এসে কেউ এভাবে ফাইনাল খেলছে, এটা অবিশ্বাস্য! তিনি যা করছেন আমাদের তার মূল্যায়ন করতে হবে। তিনি এমন কিছু অর্জন করেছেন যা কয়েক বছর আগেও অসম্ভব বলে মনে করা হতো। আমি আশা করি আমরা জিতব, তবে তা যদি নাও হয়, তবুও তিনি সবার জন্য একটি উদাহরণ হয়ে থাকবেন। আর এটিই মেসির শেষ বিশ্বকাপ কি না- এমন প্রশ্নে আর্জেন্টাইন কোচ শুধুই হেসেই উড়িয়ে দিয়ে বললেন, আমি কীভাবে জানব!
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
মেসির এই ‘লাস্ট ড্যান্স’ বা শেষ নাচ যা-ই হোক না কেন, আর্জেন্টিনা একটা বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে, একবার বিশ্বজয় তাদের আশ মেটাতে পারেনি। হাজার মাইল দূর থেকে আসা একটি পুরো দেশের আকুল প্রার্থনাকে সঙ্গী করে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এখন ট্রফির মঞ্চ থেকে মাত্র ৯০ মিনিট দূরে। তারা প্রমাণ করতে চলেছে, তাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আলমারিতে রাখা পুরোনো ট্রফিটা ছিল না, বরং সেই সোনালী ট্রফিটা আরও একবার ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে দেশের মানুষকে আনন্দে ভাসানো!
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com

