বরিশাল-ভোলা ফেরি সেবা: ৭ ট্রিপেই অচল সন্ধ্যামালতী

বরিশাল-ভোলা ফেরি সেবা: ৭ ট্রিপেই অচল সন্ধ্যামালতী

১২ July ২০২৬ Sunday ১:৪০:৪৬ PM

Print this E-mail this


বিশেষ প্রতিনিধি:

বরিশাল-ভোলা ফেরি সেবা: ৭ ট্রিপেই অচল সন্ধ্যামালতী

টানা প্রায় আড়াই বছর নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডে মেরামতের জন্য রাখা হয়েছিল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) ফেরি সন্ধ্যামালতী। সেখানে ১০ লাখের বেশি টাকা ব্যয়ে মেরামতের পর গত ঈদুল আজহার আগে বরিশালের লাহারহাট ফেরিঘাটে পাঠানো হয়। সে সময় বরিশাল থেকে ভোলা নৌপথে মাত্র সাতটি ট্রিপ দিয়ে ফের অচল হয়ে পড়ে সন্ধ্যামালতী। বিপুল টাকা ব্যয়ে সচল করা ফেরিটি এখন পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে ফেরির যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম খুলে অন্য ফেরিতে যুক্ত করছে বিআইডব্লিউটিসি। ফলে সন্ধ্যামালতীকে যাত্রীসেবায় ফেরানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বিআইডব্লিউটিসির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ফেরিটি মেরামতের দায়িত্বে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড এবং বরিশাল দপ্তরের প্রকৌশল শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। অভিযোগ উঠেছে, তাঁরা বিভিন্ন সময়ে সন্ধ্যামালতীর মতো এভাবে বিভিন্ন ফেরি মেরামতের নামে নতুনের পরিবর্তে পুরোনো ও নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে লাখ লাখ টাকা বাগিয়ে নিয়েছেন। এই অনিয়মের নেপথ্যে ডকইয়ার্ডের বিআইডব্লিউটিসির একজন কর্মকর্তা এবং বরিশাল অফিসের প্রকৌশলী সিহাব উদ্দিন জড়িত ছিলেন।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ ইস্পাহানি ২ নম্বর ডকইয়ার্ডে ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে গত ২১ মে পর্যন্ত মেরামতের জন্য পড়ে ছিল ফেরিটি। সেখানে হাইড্রোলিক পাম্প, মোটর, মূল ইঞ্জিন, সুকানের থ্রাস্টার, টিপ কনট্রোল সিস্টেম, ইঞ্জিন ওভার রোলিং, টিলার সুইচ, গিয়ার সুইচসহ যাবতীয় ব্রিজ কন্ট্রোল মেরামতের কাজ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডকে একবার ফেরি নিলে ইচ্ছা করে মাসের পর মাস ফেলে রেখে মেরামতের জন্য বাজেট বাড়ানো হয়। ফলে সন্ধ্যামালতী মেরামতেও সময় নেওয়া হয় আড়াই বছর। এতে ১০ লাখের বেশি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এরপর সন্ধ্যামালতীকে ২৬ মে বরিশালের লাহারহাট ফেরিঘাটে পাঠানো হয়। কিন্তু ঈদুল আজহার সময় মাত্র সাতটি ট্রিপ দিয়ে পুনরায় অচল হয়ে পড়ে এটি। এর আগে ২০২৪ সালের শুরুতে লাহারহাটে সার্ভিসে ছিল ফেরিটি।

সন্ধ্যামালতীর সেকেন্ড মাস্টার রিয়াজ হোসেন বলেন, ‘ফেরিটি হস্তান্তরের সময় আমরা ডকইয়ার্ড ব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ হাই আল হাদী ও প্রকৌশলী এনামুলকে বলেছিলাম, চাহিদা অনুযায়ী পছন্দের যন্ত্রপাতি ফেরিতে ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু তখন চাপ দিয়ে আমাদের সেভাবেই ফেরিটি বুঝিয়ে দিয়ে যান তাঁরা।’

তবে নারায়ণগঞ্জের ডকইয়ার্ডে দায়িত্বরত সহকারী প্রকৌশলী মো. এনামুল বলেন, ‘ফেরি মেরামত, যন্ত্রপাতি ক্রয় সবই করেছেন মেকানিক্যাল টেকনিশিয়ান সিহাব উদ্দিন। তিনি জানেন এই মালপত্রের ভালো-মন্দের খবর।’ চাহিদা অনুযায়ী যন্ত্রাংশ ও মালপত্র না দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এর দায় সিহাব উদ্দিনের।’

জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিসির নারায়ণগঞ্জ ডকের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ হাই আল হাদী জানান, তাঁরা ডকে দীর্ঘ সময় মেরামত শেষে জাহাজ বরিশালে পাঠিয়েছেন। সেখানে হাইড্রোলিক পাম্প, মোটর, মেইন ইঞ্জিন, সুকানের থ্রাস্টার ও টিপ কনট্রোল সিস্টেম মেরামত করেছিলেন। এরপর ট্রায়াল দিয়েছেন। লাহারহাটে ট্রিপও দিয়েছে কয়েকটি। এখন কেন ফেরিটি ফেলে রাখা হয়েছে, তা বরিশাল অফিস বলতে পারবে।

আব্দুল্লাহ হাই আল হাদী দাবি করেন, ‘যন্ত্রাংশ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই ডকে মেরামতে আড়াই বছর লেগেছে। যা লেগেছে, তা প্রধান কার্যালয়ের কেনা।’

বিআইডব্লিউটিসির বরিশালের প্রকৌশল শাখা জানিয়েছে, সন্ধ্যামালতী পুনরায় অচল হয়ে পড়ার মূল কারণ জাহাজের র‍্যামের হাইড্রোলিক পাম্প ও সুকানের হাইড্রোলিক পাম্প কাজ করছে না। অর্থাৎ জাহাজের র‍্যাম ওঠানামা করে না এবং সুকান ঘোরে না।

এদিকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে সার্ভিসে আনা জাহাজটি মেরামতের উদ্যোগ না নিয়ে বরং সন্ধ্যামালতীর নোঙরের কন্ট্রোলার ও হাইড্রোলিক মোটরের পাম্প খুলে অন্য জাহাজে যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে ফেরিটির ১০-১২ জন কর্মী অলস সময় পার করছেন।

অভিযোগের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসির বরিশাল কার্যালয়ের মেকানিক্যাল টেকনিশিয়ান সিহাব উদ্দিন বলেন, ‘সন্ধ্যামালতী বর্তমানে লাহারহাটে মেরামতের জন্য রাখা আছে। আমরা মালপত্রের চাহিদা দিয়েছি।’ তবে আড়াই বছর মেরামত করার পর দ্রুত কীভাবে ফেরিটি অচল হয়ে পড়ল, সে বিষয়ে কোনো উত্তর দেননি সিহাব।

এ বিষয়ে জানতে বিআইডব্লিউটিসি বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

Explore More Districts