
মুম্বাই, ২০ জুন – গ্ল্যামার, লাইমলাইট আর রাজকীয় মুকুটের আড়ালে লুকিয়ে থাকে কতটা রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, তা আরও একবার প্রমাণ হলো। ২০০৯ সালের ‘ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া’ ও বিশ্বমঞ্চে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করা বলিউড অভিনেত্রী পূজা চোপড়ার জীবনের এক অন্ধকার ও রোমহর্ষক সত্য এবার প্রকাশ্যে এনেছেন তার মা নীরা চোপড়া। সম্প্রতি একটি জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো-তে গিয়ে তিনি জানান, জন্মের পর পূজাকে অনাথ আশ্রমে ফেলে দেওয়া, এমনকি তাকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করার জন্যও চরম চাপ দিয়েছিল তার নিজের পরিবার!
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও কন্যাসন্তান হওয়ার অপরাধে একজন মাকে কতটা নারকীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, সেই গল্প শুনে আজ স্তব্ধ গোটা বলিউড।
নীরা চোপড়া জানান, বিয়ের পর প্রথম মেয়ে হওয়ার পর শ্বশুরবাড়ির আচরণ মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু দ্বিতীয়বার মা হওয়ার সময় পরিস্থিতি বিষাক্ত হয়ে ওঠে। শাশুড়ি সাফ জানিয়ে দেন, এবার ছেলে না হলে বংশের প্রদীপ জ্বলবে না।
এর ঠিক সাত বছর পর কলকাতার এক হাসপাতালে দ্বিতীয় কন্যাসন্তান হিসেবে জন্ম নেন আজকের তারকা পূজা চোপড়া। আর এখান থেকেই শুরু হয় নীরার জীবনের চরম ট্র্যাজেডি। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “পূজা হওয়ার পর টানা তিন দিন হাসপাতালে আমাকে ও আমার সদ্যজাত বাচ্চাকে দেখতে কেউ আসেনি। এমনকি আমার মেয়ের গায়ে দেওয়ার মতো কোনো কাপড় পর্যন্ত ছিল না। অন্য এক রোগীর দয়ালু পরিবারের সাহায্য নিয়ে সেবার বাচ্চার কাপড়ের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।”
সন্তান জন্মের ১০ দিন পর পূজার বাবা হাসপাতালে এলেও কোনো আনন্দ প্রকাশ করেননি। উল্টো বাড়ি ফেরার পর মাত্র ১১ দিনের মাথায় প্রসূতি নীরাকে কঠোর গৃহস্থালির কাজে নামতে বাধ্য করা হয়।
২১ দিনের সন্তান ও পকেটে মাত্র ৮১ রুপি: এক মায়ের ঐতিহাসিক মহানিষ্ক্রমণ
পূজার বয়স যখন মাত্র ২০ দিন, তখন থেকেই শুরু হয় আসল নৃশংসতা। শ্বশুরবাড়ি থেকে নীরাকে প্রতিদিন আলটিমেটাম দেওয়া হতো—হয় এই মেয়েকে গলা টিপে শেষ করে দাও, না হয় কোনো অনাথ আশ্রমে ফেলে দিয়ে এসো! কিন্তু একজন মা কি তা পারেন?
অবশেষে পূজার বয়স যখন ২১ দিন, তখন দুই মেয়েকে কোলে নিয়ে সেই নরককুণ্ড থেকে বেরিয়ে আসেন নীরা। তখন তার পকেটে ছিল মাত্র ৮১ রুপি! সেই সম্বল নিয়েই কলকাতা থেকে ট্রেনে চেপে সোজা চলে যান মুম্বাইয়ে, যেখানে তার বাবা-মা থাকতেন।
৯০০ রুপি বেতনের চাকরি থেকে আজকের গর্বিত মা
মুম্বাইয়ে এসে দুই সন্তানকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে চাকরি খুঁজতে শুরু করেন নীরা। একটি পাঁচতারকা হোটেলে গিয়ে মোনা চাওলা নামের এক সহৃদয় নারীর সান্নিধ্যে আসেন এবং নিজের জীবনের গল্প বলে মাত্র ৯০০ রুপি বেতনে একটি চাকরি পান।
কঠোর পরিশ্রমের পর ছয় বছর পর গোয়ায় ৬ হাজার রুপি বেতনের আরেকটি ভালো চাকরি পান তিনি। আর সেখান থেকেই ঘুরে যায় এই পরিবারের ভাগ্য।
নীরা আজ গর্ব করে বলেন, “ওরা এই মেয়ের জন্য আমাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল। তখন আমি বলেছিলাম, একদিন এই মেয়েই আমাকে গর্বিত করবে। আজ সত্যিই আমার মেয়ে আমাকে বিশ্বমঞ্চে গর্বিত করেছে। যদি বারবার আমার জন্ম হয়, আমি ঈশ্বরের কাছে এই দুটি মেয়েকেই ফেরত চাইব।”
ভাঙা পা নিয়ে বিশ্বমঞ্চ কাঁপানো সেই পূজা চোপড়া!
১৯৮৫ সালের ৩ মে কলকাতায় জন্ম নেওয়া পূজা চোপড়া ২০০৯ সালে ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া (ইস্ট) খেতাব জেতেন। ওই বছরই মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতার মূল পর্বের ঠিক এক সপ্তাহ আগে সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে তার গোড়ালি মারাত্মকভাবে ভেঙে যায়।
চিকিৎসকেরা তাকে তিন সপ্তাহের সম্পূর্ণ বিশ্রামের নির্দেশ দিলেও মায়ের সেই ‘লড়াকু রক্ত’ যার শরীরে, সে কি সহজে হার মানে? ভাঙা পা এবং তীব্র যন্ত্রণা নিয়েই পূজা হুইলচেয়ার আর ক্রাচে ভর দিয়ে প্রতিযোগিতায় নামেন এবং ১১২ জন বিশ্বসুন্দরীর মধ্যে টানা শীর্ষ ১৬ জনে জায়গা করে নিয়ে ইতিহাস গড়েন।
যে মেয়েকে ২০ দিন বয়সে মেরে ফেলার ফতোয়া দেওয়া হয়েছিল, সেই মেয়ের আজকের এই রাজকীয় উত্থান কোটি নারীর জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা।
এনএন/ ২০ জুন ২০২৬




