ড. আমানুর আমানের কলাম/
বাংলাদেশের সীমান্তে নতুন এক নিরাপত্তা বাস্তবতার সূচনা হয়েছে। দেশের ১১টি সীমান্তবর্তী জেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সঙ্গে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার স্বার্থেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে গত কয়েক মাসে সীমান্তে দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতি, যা প্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এটা আরও সেই মুহুর্তে করা হলো যখন বিজিবি-বিএসফ বৈঠক শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রায় ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্ত বিশ্বের অন্যতম জটিল সীমান্তগুলোর একটি। ভারতের সঙ্গে প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে প্রায় ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে রয়েছে শত শত গ্রাম, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, নদী, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও বনভূমি। এই দীর্ঘ সীমান্তের প্রতিটি অংশের নিরাপত্তা ঝুঁকি এক নয়। কোথাও মাদক চোরাচালান বড় সমস্যা, কোথাও মানবপাচার, কোথাও আবার অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত উত্তেজনা।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো সীমান্তে পুশইনের ঘটনা। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং নওগাঁ সীমান্তে একাধিকবার অভিযোগ উঠেছে যে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বিভিন্ন স্থান থেকে আটক বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বিজিবি এসব ঘটনার অনেকগুলো প্রতিহত করেছে বলে জানিয়েছে। সীমান্তে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে শুধু সীমান্ত ফাঁড়ির সদস্যদের পক্ষে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অতিরিক্ত জনবলের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
মোতায়েন করা ১১ জেলার তালিকা বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। সাতক্ষীরা, যশোর ও ঝিনাইদহ দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ, মাদক ও বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালানের করিডর হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে সাতক্ষীরার শ্যামনগর, কালীগঞ্জ ও দেবহাটা সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান সিন্ডিকেট বহু বছর ধরে সক্রিয়। যশোরের বেনাপোল ও শার্শা এলাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হলেও একই সঙ্গে এটি মানবপাচারকারীদেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ সীমান্তে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন এবং অন্যান্য মাদকের প্রবেশের অভিযোগ বহু পুরোনো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও এসব রুট পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তের দুই পাশে সক্রিয় শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
উত্তরের ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও জয়পুরহাট সীমান্তেও সাম্প্রতিক সময়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কারণ এই এলাকাগুলো দিয়ে অবৈধ যাতায়াত, গবাদিপশু পাচার এবং পণ্যের চোরাচালান সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে সিলেট সীমান্তে ভারত থেকে চিনি, মাদক এবং বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের চোরাচালান দীর্ঘদিনের সমস্যা। পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়িতে রয়েছে ভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। দুর্গম পাহাড়ি পথ, বিচ্ছিন্ন জনপদ এবং সীমান্তবর্তী বনাঞ্চল নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জটিল করে তোলে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে এখন আর শুধু চোরাচালান ঠেকানোই প্রধান কাজ নয়। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেশী অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভিবাসন সংকট, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই বাস্তবতায় আনসার বাহিনীকে সম্পৃক্ত করার পেছনে একটি কৌশলগত চিন্তাও রয়েছে। আনসার ও ভিডিপির সদস্যরা সাধারণত স্থানীয় জনগোষ্ঠী থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় তারা এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা, জনসংখ্যার গতিবিধি এবং সন্দেহজনক তৎপরতা সম্পর্কে তুলনামূলক বেশি তথ্য রাখতে পারেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, সন্দেহজনক চলাচল শনাক্তকরণ এবং দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি কেবল একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা, নাকি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশলের অংশ? সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকার সীমান্তে একটি বহুস্তরীয় নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে চায়। যেখানে বিজিবি থাকবে মূল প্রতিরক্ষা বাহিনী হিসেবে, আর আনসার-ভিডিপি সদস্যরা থাকবে সহায়ক নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে। জরুরি পরিস্থিতিতে আনসার ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত সদস্যদের দ্রুত মোতায়েনের প্রস্তুতিও সেই পরিকল্পনারই ইঙ্গিত দেয়।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, শুধুমাত্র জনবল বাড়িয়ে সীমান্তের সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। সীমান্ত অপরাধের সঙ্গে জড়িত অর্থনৈতিক স্বার্থ, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র, দারিদ্র্য এবং সীমান্তবাসীর জীবিকা সংকটও বিবেচনায় নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে চোরাচালান ও অবৈধ বাণিজ্য সীমান্ত অঞ্চলের একটি বিকল্প অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। ফলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগও প্রয়োজন।
সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো স্থানীয় জনগণের আস্থা। অতীতে বিভিন্ন এলাকায় সীমান্তে গুলিতে হতাহতের ঘটনা, অনুপ্রবেশের অভিযোগ এবং অপরাধী চক্রের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। নতুন এই ব্যবস্থার সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ওপর।
বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকের মধ্যেই নতুন মোতায়েন, বাড়ছে কৌশলগত গুরুত্ব/
বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে আরেকটি বিষয়। আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের সীমান্তে মোতায়েনের ঘোষণা এসেছে ঠিক সেই সময়ে, যখন বিজিবি ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক শুরু হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সীমান্তে পুশইন, অনুপ্রবেশ, সীমান্ত হত্যা, মাদক ও মানবপাচারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও উত্তেজনা সমানতালে চলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তে ভারত থেকে লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিজিবি একাধিকবার দাবি করেছে, সীমান্তে পুশইনের বেশ কয়েকটি চেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে এবং যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে গ্রহণ করবে না।
এই পরিস্থিতিতে বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক শুরু হওয়ার মুহূর্তে সীমান্তের ১১ জেলায় অতিরিক্ত জনবল মোতায়েনকে অনেকেই একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ একদিকে যেমন কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত সমস্যার সমাধান চাইছে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে নজরদারি ও প্রস্তুতি বাড়িয়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের দুর্বলতার সুযোগ দিতে চায় না।
ঢাকার একজন সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সীমান্তে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েনকে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে এটি নিঃসন্দেহে একটি কৌশলগত বার্তা যে বাংলাদেশ সীমান্ত পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত রয়েছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্ত নিরাপত্তা শুধু চোরাচালান বা অনুপ্রবেশের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার, আন্তঃদেশীয় অপরাধ চক্র এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়। ফলে বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকের পাশাপাশি সীমান্তে নতুন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার পদক্ষেপকে একটি সমন্বিত কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, আনসার মোতায়েন করা হয়েছে এমন জেলাগুলোতে, যেগুলোর অনেকগুলোই সাম্প্রতিক পুশইন প্রচেষ্টা, মাদক চোরাচালান এবং সীমান্ত উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আলোচনায় ছিল। সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ এবং দিনাজপুর সীমান্তে গত কয়েক মাসে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি কেবল সীমান্তে অতিরিক্ত নজরদারির উদ্যোগ, নাকি ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা প্রস্তুতি? সরকারি সূত্র এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু না বললেও সময় নির্বাচন এবং সীমান্ত পরিস্থিতির সাম্প্রতিক বাস্তবতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাংলাদেশের নিরাপত্তা নীতিনির্ধারকেরা সীমান্তকে এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করছেন।
+++++
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস


