ড. আমানুর আমানের কলাম
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে বাস পড়ে যাওয়ার দুটি ঘটনার মধ্যে ব্যবধান মাত্র আড়াই মাস। কিন্তু দুই ঘটনার ফলাফল সম্পূর্ণ ভিন্ন—একটিতে ২৬ জন যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন, অন্যটিতে ৩৭ জন যাত্রী অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন। তবে দুর্ঘটনা দুটি শুধু বাসের ভেতরে যাত্রী উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির গল্প নয়—এটি ব্যবস্থাপনা, চালকের দক্ষতা এবং ঘাটের অবকাঠামোগত ঝুঁকিরও প্রতিচ্ছবি।
চলতি বছরের ২৫ মার্চ দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে ডুবে যায়। সেই সময় বাসের ভেতরেই ছিলেন যাত্রীরা। কেউ সময়মতো বের হতে পারেননি। মুহূর্তের মধ্যে ভারী যানটি নদীর গভীরে তলিয়ে যায়। ২৬ জন যাত্রী প্রাণ হারান সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায়।
আর ঠিক একই জায়গায়, একই ধরনের পরিস্থিতিতে, ৫ জুন আবারও ঘটল আরেকটি ঘটনা। এবার এসবি পরিবহনের একটি বাস ফেরিতে ওঠার প্রস্তুতিকালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে র্যাম্প ভেঙে নদীতে পড়ে যায়। কিন্তু বড় পার্থক্য ছিল—এইবার যাত্রীদের আগেই বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে ৩৭ জন যাত্রী ২০–৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন। অনেক যাত্রীই পরে বলেন, এই সামান্য সময় ব্যবধানই তাদের জীবন বাঁচিয়েছে।
এই দুই ঘটনার মিল এতটাই স্পষ্ট যে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—একই জায়গায়, একই ধরনের দুর্ঘটনা কেন বারবার ঘটছে?
ঘাট সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেরিতে ওঠার সময় বাসের ভেতরে যাত্রী রাখা হবে কি না—এই সিদ্ধান্তই জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দেয়। ২৫ মার্চের ঘটনায় সেই নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয়নি বা পরিস্থিতি অনুযায়ী কার্যকর হয়নি। কিন্তু ৫ জুনের ঘটনায় নৌ-পুলিশ ও ঘাট কর্তৃপক্ষ কঠোরভাবে যাত্রী নামিয়ে দেয়, যা একটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাকে বড় ধরনের শোকের ঘটনা থেকে রক্ষা করে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে আসে, বাসটি ফেরির র্যাম্পে ওঠার সময় হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারায়। ভারী যানবাহনটি ঢালু কাঠামোর ওপর সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জটিল কাজ। সামান্য গতি বা ব্রেকের ভুল, কিংবা গিয়ার নিয়ন্ত্রণে অসতর্কতা বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। স্থানীয়রা বলছেন, অনেক চালকই এই ঘাটে নিয়মিত যাতায়াত করলেও বিশেষ প্রশিক্ষণের অভাব এবং চাপের কারণে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন।
ঘাট ব্যবস্থাপনার দিকেও রয়েছে প্রশ্ন। প্রতিদিন শত শত বাস ও ট্রাক এই ঘাট ব্যবহার করে। কিন্তু র্যাম্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিগন্যালিং এবং নিয়ন্ত্রণ কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিক মানের নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে একটি ছোট ভুলও বড় দুর্ঘটনায় রূপ নেয়।
তবে ৫ জুনের ঘটনায় একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে সামনে এসেছে—নিয়ম কঠোরভাবে মানা হলে প্রাণহানি অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব। যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তই এই দুর্ঘটনাকে মৃত্যুর মিছিল থেকে রক্ষা করেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, তাহলে বারবার একই ধরনের দুর্ঘটনা কেন ঘটছে? বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একক কোনো পক্ষের দায় নয়। বরং এটি একটি সমন্বিত দুর্বলতার ফল—ঘাটের অবকাঠামো, চালকের দক্ষতা, যানবাহন ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি একসঙ্গে কাজ করছে।
২৫ মার্চের দুর্ঘটনাটি ছিল শুধু একটি সড়ক–নৌ দুর্ঘটনা নয়, বরং দৌলতদিয়া ফেরিঘাট ব্যবস্থার দুর্বলতার একটি কঠিন বাস্তব উদাহরণ। সেই ঘটনায় ২৬ জন যাত্রীর মৃত্যু ঘটার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে—প্রশাসন থেকে শুরু করে পরিবহন খাত, এমনকি সাধারণ মানুষ পর্যন্ত এই ঘাটের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই আলোচনা ও সতর্কবার্তা মাঠপর্যায়ের কাঠামোগত পরিবর্তনে যথেষ্টভাবে রূপ নেয়নি। ফলে যে ধরনের ঝুঁকি ওই ঘটনার সময় স্পষ্ট হয়েছিল, তা দূর হয়নি; বরং একই ধরনের পরিস্থিতি আবারও তৈরি হয়েছে। ৫ জুনের দুর্ঘটনা সেই অনিষ্পন্ন ঝুঁকিরই পুনরাবৃত্তি। পার্থক্য হলো, এবার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রটোকল—যাত্রী নামিয়ে দেওয়া—কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। এই একটি পদক্ষেপই সম্ভাব্য মৃত্যুর মিছিলকে রুখে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানে মূল সমস্যা হলো “সিস্টেম লার্নিং গ্যাপ”—অর্থাৎ একটি বড় দুর্ঘটনার পর যে শিক্ষা নেওয়া হয়, তা নীতিমালায় বা বাস্তব প্রয়োগে পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয় না। ২৫ মার্চের ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদার, র্যাম্প ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, চালক প্রশিক্ষণ এবং লোডিং প্রক্রিয়া আরও নিয়ন্ত্রিত করার যে দাবি উঠেছিল, তার অনেক কিছুই কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি বা ধারাবাহিকতা পায়নি। এর ফলে ঘাটের দৈনন্দিন কার্যক্রম আগের মতোই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়ে গেছে। যানবাহনের চাপ, সময়মতো ফেরি ছাড়ার তাগিদ, এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে একটি “রুটিন ঝুঁকি পরিস্থিতি” তৈরি হয়েছে, যেখানে দুর্ঘটনা আর ব্যতিক্রম নয়, বরং সম্ভাব্য ঘটনা হিসেবে থেকে যাচ্ছে।
তবে ৫ জুনের ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে—শৃঙ্খলা ও প্রটোকল মেনে চললে একই অবকাঠামোর মধ্যেও বড় প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব। অর্থাৎ সমস্যা শুধু অবকাঠামোয় নয়, বরং ব্যবস্থাপনা ও বাস্তব প্রয়োগের দুর্বলতাতেও নিহিত।
এই দুই ঘটনার তুলনা তাই একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—দুর্ঘটনার পর দেওয়া প্রতিক্রিয়া যদি মাঠপর্যায়ে স্থায়ী পরিবর্তনে রূপ না নেয়, তবে একই ধরনের বিপর্যয় বারবার ফিরে আসতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, দৌলতদিয়া ঘাটে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ছাড়া এই ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে চালকদের প্রশিক্ষণ, ফেরিতে ওঠার আগে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রী ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা জরুরি।
সবশেষে এই দুটি ঘটনা যেন এক কঠিন বার্তা দিয়ে যায়—পদ্মা নদীর এই ঘাটে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান কখনো কখনো মাত্র কয়েক সেকেন্ড, আর সেই কয়েক সেকেন্ডই নির্ধারণ করে দেয় একটি পরিবার বাঁচবে, নাকি নিঃশেষ হয়ে যাবে।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস
ব্যবধান আড়াই মাস/ পদ্মায় দুই ফেরিঘাট দুর্ঘটনা: একটিতে মৃত্যু, আরেকটিতে রক্ষা—কেন বারবার ঘটছে একই ঘটনা?
- Tags : আড়ই, আরকটত, একই, একটত, ঘটছ, ঘটন, দই, দরঘটন, পদময়, ফরঘট, বযবধন, বরবর, মতয, মস, রকষকন
Recent Posts
Explore More Districts
- Khulna District Newspapers
- Chattogram District Newspapers
- Dhaka District Newspapers
- Barisal District Newspapers
- Sylhet District Newspapers
- Rangpur District Newspapers
- Rajshahi District Newspapers
- Mymensingh District Newspapers
- Gazipur District Newspapers
- Cumilla district Newspapers
- Noakhali District Newspapers
- Faridpur District Newspapers
- Pabna District Newspapers
- Narayanganj District Newspapers
- Narsingdi District Newspapers
- Kushtia District Newspapers
- Dinajpur District Newspapers
- Bogura District Newspapers
- Jessore District Newspapers
- Bagerhat District Newspapers
- Barguna District Newspapers
- Bhola District Newspapers
- Brahmanbaria District Newspapers
- Chuadanga District Newspapers
- Chandpur District Newspapers
- Chapainawabganj District Newspapers
- Coxs Bazar District Newspapers
- Feni District Newspapers
- Gaibandha District Newspapers
- Gopalganj District Newspapers
- Habiganj District Newspapers
- Jamalpur District Newspapers
- Jhalokati District Newspapers
- Jhenaidah District Newspapers
- Joypurhat District Newspapers
- Kurigram District Newspapers
- Kishoreganj District Newspapers
- Khagrachhari District Newspapers
- Lakshmipur District Newspapers
- Lalmonirhat District Newspapers
- Madaripur District Newspapers
- Magura District Newspapers
- Manikganj District Newspapers
- Meherpur District Newspapers
- Naogaon District Newspapers
- Munshiganj District Newspapers
- Moulvibazar District Newspapers
- Narail District Newspapers
- Natore District Newspapers
- Netrokona District Newspapers
- Nilphamari District Newspapers
- Panchagarh District Newspapers
- Patuakhali District Newspapers
- Pirojpur District Newspapers
- Rajbari District Newspapers
- Rangamati District Newspapers
- Satkhira District Newspapers
- Shariatpur District Newspapers
- Sherpur District Newspapers
- Sirajganj District Newspapers
- Sunamganj District Newspapers
- Tangail District Newspapers
- Thakurgaon District Newspapers


