মানিকগঞ্জ পুলিশ লাইনের যানবাহন শাখায় কোটি টাকার অনিয়ম-লুটপাট!

মানিকগঞ্জ পুলিশ লাইনের যানবাহন শাখায় কোটি টাকার অনিয়ম-লুটপাট!

সাইফুল ইসলাম : মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশ লাইনের যানবাহন শাখা (এমটি শাখা) ঘিরে জ্বালানি তেল আত্মসাৎ, ভুয়া ভাউচার তৈরি, অতিরিক্ত বিল উত্তোলন, সরকারি অর্থ লোপাট, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার এবং জব্দকৃত মালামাল আত্মসাতের বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মে এমটি শাখার টিএসআই খালেদুর রহমান খালেদ (এমটি-১), মুন্সি কনস্টেবল প্রদ্যুত বর্মন ও কনস্টেবল মনসুরের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক পুলিশ সদস্য ও বিভিন্ন সূত্র।

Khaled

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলা পুলিশের নিজস্ব যানবাহনের পাশাপাশি বিভিন্ন পাবলিক যানবাহন রিকুইজিশনের মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়। নির্বাচনে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের খাবার সরবরাহের কথা উল্লেখ করে ২৬৮টি গাড়ি ব্যবহারের বিল দেখানো হয়। প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে ১৫০ লিটার হিসেবে মোট ৪০ হাজার ২ শত লিটার জ্বালানি তেল ইস্যু করেন টিএসআই খালেদুর রহমান খালেদ।

তবে জেলার বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করা অন্তত ২০ জন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুলিশ লাইন থেকে খাবার বহনের জন্য কোনো গাড়ি নির্বাচনী কেন্দ্রে যায়নি। দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা নিজ উদ্যোগেই খাবারের ব্যবস্থা করেছেন।

এছাড়া জ্বালানি তেল ইস্যু ও মাইলেজ সংক্রান্ত ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন যানবাহনের মাইলেজ বেশি দেখিয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল উত্তোলন করা হয়। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ২৫ লিটার বরাদ্দ দেখিয়ে বাস্তবে ১৫ লিটার তেল সরবরাহ করা হলেও পুরো ২৫ লিটারের বিল উত্তোলন করা হয়।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, পুলিশ লাইনে দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় পড়ে থাকা গাড়ির নামেও নিয়মিত জ্বালানি তেলের বিল উত্তোলন করা হচ্ছে। অনেক গাড়ি সারাদিন পুলিশ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও মাসে ৩৫০ থেকে ৪৫০ লিটার পর্যন্ত তেল খরচ দেখানো হয়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রিজন ভ্যান (ঢাকা মেট্রো-অ ১১-১৬৫২), পুলিশ বাস (ঢাকা মেট্রো-শ ১৪-০২৭৩)সহ বিভিন্ন অচল যানবাহনের বিপরীতে প্রতি মাসে শত শত লিটার জ্বালানি তেলের বিল করা হয়। একইভাবে জেনারেটরেও অতিরিক্ত তেল ব্যবহারের হিসাব দেখানো হয়।

এছাড়া সরকারি যানবাহন ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে টিএসআই খালেদুর রহমান খালেদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তার ব্যক্তিগত প্রাইভেট কার (মানিকগঞ্জ ৯-০২-০১০২)-এ নিয়মিত সরকারি তেল ব্যবহার করা হয় এবং সরকারি অর্থে গাড়ির মেরামতও করানো হয়।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি দেশব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকটকালীন সময়ে ফিলিং স্টেশন থেকে ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে মুন্সি কনস্টেবল প্রদ্যুত বর্মন ৬৬ হাজার টাকা উত্তোলন করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে যানবাহন শাখার পরিদর্শক পাম্প কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জরিমানা প্রদানপূর্বক আপোষ-মীমাংসা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, টিএসআই খালেদুর রহমান খালেদ ও প্রদ্যুত বর্মন ও মনসুরের যোগসাজশে মানিকগঞ্জের উচুটিয়া এলাকার “রাতুল অটো মোবাইলস”-এ প্রকৃত কাজ সম্পন্ন করলেও “শিকদার ট্রেডার্স” নামে অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে ভাউচার সংগ্রহ করে অতিরিক্ত বিল উত্তোলন করা হয়। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ক্রয় করে অধিক মূল্যের ভাউচার দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। কখনও গাড়ি মেরামত না করেও বিল উত্তোলন এবং যন্ত্রাংশ ক্রয় ছাড়াই ভুয়া মেমো দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া জব্দকৃত গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও মালামাল অবৈধভাবে বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে। এ বিষয়ে রাতুল অটো মোবাইলস এর মালিক মুকুল মেহেদী জানান, পুলিশ লাইনের বিভিন্ন গাড়ি তার দোকান থেকে মেরামত করা হলেও কখনও মেমো বা ভাউচার নেয়না পুলিশ। আরেক ব্যবসায়ী রুবেল বলেন, কিছুদিন আগে একটি গাড়ির কাজ করিয়ে ২৪ হাজার টাকা বিল হয়। কিন্ত আমাকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বিল করতে বলেছিল। কিন্ত আমি রাজি হইনি। পুলিশের গাড়ির কাজ করলেই এমন ঝামেলা পোহাতে হয়। এজন্য এখন পুলিশের গাড়ির কাজ করিনা।

বর্তমানে অন্য একটি দোকানে কর্মরত শিকদার ট্রেডার্স এর সাবেক ম্যানেজার সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, ঢাকা ও মানিকগঞ্জের বিভিন্ন দোকান থেকে মাল কিনে আমাদের দোকান থেকে বিল করা হতো। দুই তিন মাস পরপরই ৫-৬ লাখ টাকা করে বিল করতো।

Manikganj police line

যানবাহন মেরামতের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত বিল উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের কিলো গাড়ি (মানিকগঞ্জ-ন ১১-০০১১)-এর ডেন্টিং-পেইন্টিং কাজে প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ হাজার টাকা, ঘিওর থানার গাড়ি (গাজীপুর-ছ ১১-০১৭৫)-এর কাজে প্রায় ৭০ হাজার টাকা এবং মানিকগঞ্জ সদর সার্কেলের গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঠ ১৮-২৯৫৫)-এর কাজে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি গাড়ির মূল্যবান যন্ত্রাংশ খুলে অবৈধভাবে বিক্রি করা হয়েছে। এছাড়া জেলা পুলিশের বিভিন্ন যানবাহনে মবিল পরিবর্তনের বিলেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়মিত মবিল পরিবর্তন না করেও প্রতি মাসে পরিবর্তনের বিল দেখানো হয়। অনেক সময় নতুন মবিলের সঙ্গে পুরোনো মবিল মিশিয়ে ব্যবহার করা হলেও সম্পূর্ণ নতুন মবিল ব্যবহারের বিল উত্তোলন করা হয়। এতে যানবাহনের ইঞ্জিন মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

থানা পুলিশের ব্যবহারের জন্য নতুন লেগুনা ক্রয় ও মেরামতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা বৃদ্ধি ও সংকট পরিস্থিতিকে পুজি করে টিএসআই খালেদুর রহমান খালেদ, কনস্টেবল প্রদ্যুত বর্মন ও কনস্টেবল মনসুর পুলিশি প্রভাব কাজে লাগিয়ে পুলিশ লাইন সংলগ্ন ধলেশ্বরী ফিলিং স্টেশন থেকে জোরপূর্বক ড্রামভর্তি তেল সংগ্রহ করেন। পরে সেই জ্বালানি তেল এমটি শাখা এবং পুলিশ লাইনের সামনে অবস্থিত মো. হারুনের স্টিলের দোকানে মজুদ রাখা হতো। পরবর্তীতে এসব তেল পুলিশ সদস্য ও সাধারণ মানুষের কাছে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা হয়।

গত ২৫ এপ্রিল কনস্টেবল মনসুর ও প্রদ্যুত বর্মন যৌথভাবে দুই ড্রাম ডিজেল ও এক ড্রাম পেট্রোল সংগ্রহ করে মো. হারুনের দোকানে রাখেন। পরে ডিজেল ১৫০ টাকা লিটার এবং পেট্রোল ১৫৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি করা হয়। এ বিষয়ে মো. হারুনের স্বীকারোক্তিমূলক একটি অডিও রেকর্ড এসেছে এই প্রতিবেদকের কাছে। ওই অডিও রেকর্ডে তাকে বলতে শোনা যায়, “কনস্টেবল মনসুর ও প্রদ্যুত বর্মন বেশ কয়েকবার আমার দোকানে পেট্রোল ও ডিজেল রেখেছিল। পরে সেগুলো বেশি দামে বিক্রি করেছে।”

Manikganj
ডাকাতি মামলায় জব্দকৃত এই গাড়ি থেকেই ৬ টি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, খালেদুর রহমান খালেদ, প্রদ্যুত বর্মন ও মনসুরের যোগসাজসে ২০১৮ সালের একটি ডাকাতি মামলার জব্দকৃত গাড়ি পুলিশ লাইনে সংরক্ষিত থাকাবস্থায় বিভিন্ন সময়ে সেই গাড়ির মূল্যবান যন্ত্রাংশ খুলে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সুত্রমতে, সর্বশেষ গত ১৯ এপ্রিল ওই গাড়ি থেকে ৬টি গ্যাস সিলিন্ডার খুলে বিক্রি করা হয়। এ কাজে বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন একটি গাড়ি মেরামতের দোকানের মিস্ত্রি নারু সহযোগিতা করেছেন বলে সুত্র নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত কনস্টেবল প্রদ্যুত বর্মন দাবি করেন, যন্ত্রপাতি ক্রয় কিংবা বাহিরের কাজের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তিনি বলেন, “আমি শুধু বিল-ভাউচার তৈরি ও রেজিস্টার মেইনটেইন করেছি। স্যার আমাকে যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি সেভাবেই কাজ করেছি। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার সঙ্গে আমি জড়িত নই।”

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে টিএসআই খালেদুর রহমান খালেদ তার বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, “নির্বাচনের দিন জ্বালানি তেল বরাদ্দের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। এ বিষয়ে এসপি স্যার অবগত আছেন। রাতুল অটো মোবাইলস ও রাজা মিয়ার গ্যারেজে গাড়ি মেরামতের পর যথাযথ বিল গ্রহণ করা হয়। নিম্নমানের মবিল ব্যবহার করা হয় না। বড় গাড়িতে ৫ লিটারের এবং মোটরসাইকেলে ১ লিটারের বোতলজাত মবিল ব্যবহার করা হয়।”

অচল যানবাহনে জ্বালানি তেলের বিল করার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি এখানে যোগদানের আগে এ ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। তবে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর অচল গাড়িতে তেলের বিল করা বন্ধ করেছি। আমার আমলে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।”

যন্ত্রপাতি ও মালামাল ক্রয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, “যেখান থেকে মালামাল কেনা হয়, সেখানকার মেমো ব্যবহার করেই বিল করা হয়।”

ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়ে ওঠা অভিযোগও অস্বীকার করেন খালেদ। তিনি বলেন, “আমার ব্যক্তিগত কোনো গাড়ি নেই। যে গাড়ির কথা বলা হচ্ছে সেটি পুলিশ লাইনের ড্রাইভার রাজ্জাকের বন্ধুর। গাড়ির মালিককে তার গাড়ি দিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া ঢাকার রায়েরবাগে আমার কোনো ফ্ল্যাট বা বাড়ি নেই। আমি কয়েক বছর ধরে ভাড়া বাসায় থাকছি।”

জ্বালানি তেল সংগ্রহ ও মজুদের বিষয়ে তিনি নিজেকে অবগত নন বলে দাবি করেন। জব্দকৃত গাড়ির সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “৫টি সিলিন্ডার বিক্রি করা হয়নি। সেগুলো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় খুলে গোডাউনে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।”

এসব বিষয়ে মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম বলেন, “ইতোপূর্বে কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। অভিযোগের পর টিএসআই খালেদুর রহমান খালেদকে বদলি করা হয়েছে। বাকি দুই পুলিশ সদস্যসহ সকলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

Zoom Bangla News

Zoom Bangla News

inews.zoombangla.com


Follow

Follow iNews Zoombangla On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from iNews Zoombangla in your Google news feed.


Follow iNews Zoombangla On Google

Explore More Districts