
বেইজিং, ১৯ মে – কোথাও জলমগ্ন রাস্তায় হাঁটু পানিতেই দিব্যি সাঁতরে বেড়াচ্ছে নদী থেকে ভেসে আসা জ্যান্ত মাছ, আর মানুষ লাঠি নিয়ে সেই মাছ ধরছে। আবার কোথাও আস্ত গাড়িগুলো সাবমেরিনের মতো পুরোপুরি তলিয়ে গেছে পানির নিচে।
শুনতে সিনেমার দৃশ্য মনে হলেও, এটাই এখন চীনের দক্ষিণাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের বাস্তব চিত্র। গত কয়েকদিনের রেকর্ডভাঙা প্রবল বৃষ্টিপাত, ভয়াবহ বন্যা ও আকস্মিক ভূমিধসে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে দেশটির বিশাল এলাকা। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে অন্তত ১০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, চীনের আবহাওয়া অধিদপ্তর (সিএমএ) মঙ্গলবারও দেশজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি রেখেছে। আবহাওয়াবিদদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি—প্রবল বর্ষণের এই ধারা এখন তার সবচেয়ে শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করেছে।
কিন্তু কেন হঠাৎ এই প্রলয়ংকরী রূপ প্রকৃতির? আবহাওয়াবিদরা এর পেছনে এক ভয়ঙ্কর ভৌগোলিক কারণ খুঁজে পেয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, এবারের দুর্যোগটি সাধারণ কোনো বৃষ্টি নয়। বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ চীন সাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগর—এই তিনটি বিশাল জলভাগ থেকে ধেয়ে আসা জলীয় বাষ্পের এক অভূতপূর্ব ও শক্তিশালী মিশ্রণের ফলেই চীনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এই তীব্র ও অবিরাম বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
টানা বৃষ্টিপাতের কারণে বিশেষ করে মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি (CCTV)-র তথ্যমতে, হুবেই প্রদেশের প্রায় ৩৩৭টি উপজেলা গত ৪৮ ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাতে ডুবে গেছে।
দুর্যোগের কবলে পড়ে যেভাবে প্রাণহানি ঘটেছে:
গুয়াংশি প্রদেশ: ভারী বৃষ্টির মধ্যে ১৫ জন যাত্রী নিয়ে একটি পিকআপ ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পানিতে উপচে পড়া একটি নদীতে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ৬ জনের মৃত্যু হয়।
হুবেই প্রদেশ: একটি নিচু গ্রামে হঠাৎ ধেয়ে আসা হড়পা বানে (Flash Flood) ভেসে গিয়ে ৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
হুনান প্রদেশ: এখানেও বন্যার পানিতে ডুবে আরও ১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং ত্রাণ তৎপরতা গতিশীল করতে চীনের ‘স্টেট ফ্লাড কন্ট্রোল অ্যান্ড ড্রাউট রিলিফ হেডকোয়ার্টার্স’ হুনান ও গুয়াংশি প্রদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ‘লেভেল-ফোর’ জরুরি অবস্থা জারি করেছে। এছাড়া হুবেই, চংকিং ও গুইঝু প্রদেশেও সর্বোচ্চ সতর্কতা বহাল রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে মানুষের জীবন বাঁচাতে সমস্ত স্কুল, কলেজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং গণপরিবহন সেবা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হুবেই ও হুনানের উপদ্রুত এলাকাগুলো থেকে হাজার হাজার বাসিন্দাকে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিচ্ছে উদ্ধারকারী দল।
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে আধুনিক প্রযুক্তির পরাশক্তি চীনও এখন কার্যত অসহায়। এখন দেখার বিষয়, এই বিশাল প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা করে কত দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে দেশটি।
এনএন/ ১৯ মে ২০২৬



