
ঠাকুরগাঁও, ১৩ মে – একাত্তরের সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে নিজের সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়ে যিনি পরিবারের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন, সেই মহীয়সী নারী বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী (৭২) আর নেই। মঙ্গলবার রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বুধবার সকালে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘গার্ড অব অনার’ প্রদানের মাধ্যমে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু তার বিদায়বেলায় আবারও সামনে এল একাত্তর থেকে আজ অবধি বয়ে চলা এক দীর্ঘ কষ্টের ইতিহাস।
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের সেই অভিশপ্ত দিন। চারদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডব। পরিবারের সদস্যদের প্রাণ বাঁচাতে মাত্র ১৭ বছর বয়সে টেপরী রাণীকে পাকিস্তানি ক্যাম্পে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তার বাবা। সেই যাত্রায় বাবা-মেয়ের কথা হয়নি, ছিল শুধু গুমরে মরা কান্না। টানা সাত মাস ক্যাম্পে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি। নিজের জীবন বাজি রেখে তিনি রক্ষা করেছিলেন পরিবারের অন্যদের।
দেশ স্বাধীন হলো ঠিকই, কিন্তু টেপরী রাণীর জন্য যুদ্ধ শেষ হয়নি। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় যখন বাড়ি ফিরলেন, সমাজ তাকে ‘অশুচি’ বলে দূরে সরিয়ে দিতে চাইল। পেটের সন্তানকে নষ্ট করার জন্য এল প্রবল চাপ। তবে সেবার মেয়ের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তার বাবা। বলেছিলেন, “এই সন্তানই হবে তোর বেঁচে থাকার অবলম্বন।”
টেপরী রাণীর কোল আলো করে জন্ম নেওয়া ছেলে সুধীর বর্মনের শৈশব কেটেছে লাঞ্ছনায়। সমাজ তাকে ‘পাঞ্জাবির বাচ্চা’ বলে কটূক্তি করত। বর্তমানে ভ্যানচালক সুধীর আজও সেই কষ্টের দিনগুলো ভোলেননি। ২০১৭ সালের আগে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো স্বীকৃতিও পাননি এই বীরাঙ্গনা। স্বীকৃতির পর দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হলে তার ত্যাগের কথা নতুন প্রজন্ম জানতে পারে।
বুধবার সকালে রাণীশংকৈল উপজেলার বলিদ্বারা গ্রামে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। ইউএনও খাদিজা বেগম ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
সুধীর বর্মন বলেন, “আমাকে নিয়ে মাকে অনেক অপমান সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু দেশের জন্য মায়ের যে ত্যাগ, তা ইতিহাস হয়ে থাকবে। বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি পাওয়ার পর মা কিছুটা শান্তি পেয়েছিলেন।”
টেপরী রাণী কেবল একজন বীরাঙ্গনা নন, তিনি আমাদের স্বাধীনতার এক জীবন্ত দলিল। যে সমাজের জন্য তিনি সব হারিয়েছিলেন, সেই সমাজই তাকে জীবদ্দশায় বারবার ক্ষতবিক্ষত করেছে। আজ তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে একটি ত্যাগের অধ্যায় শেষ হলো। আমরা কি পেরেছি তাকে উপযুক্ত সম্মান দিতে?
এনএন/ ১৩ মে ২০২৬




