বরিশালের বাবুগঞ্জে অ্যান্টিভেনম ও জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সংকট : বাড়ছে সাপে কাটা রোগীর মৃত্যু

বরিশালের বাবুগঞ্জে অ্যান্টিভেনম ও জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সংকট : বাড়ছে সাপে কাটা রোগীর মৃত্যু

৩ May ২০২৬ Sunday ৭:০১:০৮ PM

Print this E-mail this


অনলাইন নিউজ ডেস্ক:

বরিশালের বাবুগঞ্জে অ্যান্টিভেনম ও জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সংকট : বাড়ছে সাপে কাটা রোগীর মৃত্যু

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা যখন বিশ্বজুড়ে জীবন রক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, তখন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় মৌলিক জরুরি চিকিৎসাসেবার অভাবে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেনম এবং জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিনের সংকট স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের ২৮ বছর বয়সী যুবক এইচ এম সায়েম সম্প্রতি বিষধর সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন। দ্রুত তাকে বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলেও সেখানে অ্যান্টিভেনম না থাকায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।তবে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।

একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে গত ২ মে। উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ভূতেরদিয়া নতুনচর গ্রামের ৬০ বছর বয়সী হানিফ শরীফ গরুর ঘাস কাটার সময় সাপের কামড়ে গুরুতর অসুস্থ হন। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও পথেই তার মৃত্যু হয়।

চাঁদপাশা ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. জুয়েল হোসেন অভিযোগ করে বলেন,‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম না থাকায় আমার ভাইকে বরিশালে নিতে হয়েছিল। দেরি হওয়ায় তিনি মারা যান।’

প্রায় ১৬৪ দশমিক ৮৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বাবুগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৫১৮ জন মানুষের বসবাস। অথচ এখানে একটি ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকলেও কার্যত সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়া হচ্ছে।সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—জরুরি জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিভেনম সেখানে একদম নেই।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় প্রথম এক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ হিসেবে পরিচিত। এই সময়ের মধ্যে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ না করা গেলে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

এ বিষয়ে বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার পূর্বসূরি অ্যান্টিভেনমের চাহিদাপত্র পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যায়নি। দায়িত্ব নেওয়ার পর আমিও জেলা সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একাধিকবার চাহিদা পাঠিয়েছি।’

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে চার ধরনের বিষধর সাপ রয়েছে। এর মধ্যে গোখরা সাপের বিষ দ্রুত স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত হানে, ফলে এক ঘণ্টার মধ্যেই রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে যেতে পারে।

শুধু সাপের কামড় নয়, জলাতঙ্ক (রেবিস) প্রতিরোধী ভ্যাকসিন সংকট নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর সময়মতো ভ্যাকসিন না পেলে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় নিশ্চিত বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং জীবনরক্ষাকারী ইনজেকশনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে রোগীদের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যেতে হচ্ছে, যা অনেক সময় প্রাণঘাতী বিলম্ব তৈরি করছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়,শুধু সরবরাহ সংকট নয়—স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে উপজেলা পর্যায়ে ওষুধ সরবরাহ চেইন, বাজেট বরাদ্দ এবং চাহিদা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতাও বড় কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, উপজেলা পর্যায়ে সাপে কাটা ও জলাতঙ্কের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব নয়। এটি শুধু চিকিৎসা সংকট নয়, বরং নীতিগত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতারও প্রতিফলন।

বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস এম মনজুর-এ-এলাহী বলেন,‘অ্যান্টি-র‌্যাবিস ভ্যাকসিন বর্তমানে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সংকটে রয়েছে। ইনসেপ্টা কম্পানি সরবরাহ করলেও চাহিদা অনুযায়ী তা পাওয়া যাচ্ছে না। সাপে কাটার অ্যান্টিভেনম পর্যাপ্ত রয়েছে এবং দ্রুতই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরবরাহ করা হবে।’

বাবুগঞ্জের এই পরিস্থিতি শুধু একটি উপজেলার স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং উপজেলা পর্যায়ের জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

দ্রুত অ্যান্টিভেনম ও জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত না করা গেলে এ ধরনের প্রাণহানি রোধ করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

Explore More Districts