দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
দেশের ভোজ্যতেলের বাজারে আবারও অস্থিরতা বাড়ছে। খুচরা দোকানগুলোতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। কোথাও কোথাও তেল কিনতে বাধ্যতামূলকভাবে অন্য পণ্য নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। খোলা তেলও বিক্রি হচ্ছে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—দেশ কি বড় ধরনের সয়াবিন সংকটের দিকে এগোচ্ছে? আর যদি তাই হয়, তবে এর দায় কতটা বর্তমান পরিস্থিতির আর কতটা সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত গাফিলতির?
বাজার বিশ্লেষক, আমদানিকারক ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান সংকটের জন্য শুধু আন্তর্জাতিক বাজারকে দায়ী করলে বাস্তব চিত্র আড়াল করা হবে। তাদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে দাম বৃদ্ধির চাপ থাকলেও দেশের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে নীতিগত অস্থিরতা, মূল্য সমন্বয়ে বিলম্ব, দুর্বল বাজার তদারকি এবং আগাম পরিকল্পনার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও সংকটপূর্ণ করে তুলেছে।
তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ার পর থেকেই আমদানিকারকরা সরকারকে বারবার মূল্য পুনর্নির্ধারণের অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর সিদ্ধান্ত না হওয়ায় ব্যবসায়ীদের একাংশ নতুন এলসি খোলা কমিয়ে দেয়। এতে ধীরে ধীরে আমদানি কমতে থাকে, যার প্রভাব এখন সরাসরি বাজারে দৃশ্যমান।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সময়মতো বাজার পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে রমজান ও কোরবানির ঈদের মতো উচ্চ চাহিদার মৌসুম সামনে রেখেও পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিতে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে সরবরাহ চেইনে চাপ তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট, অতিরিক্ত মুনাফা এবং সিন্ডিকেটনির্ভর নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বাজার বাস্তবতার সঙ্গে দামের অসামঞ্জস্য থাকলে আমদানিকারকদের পক্ষে দীর্ঘদিন লোকসান দিয়ে পণ্য আমদানি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আর সেই সুযোগেই একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বাজারে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে অস্থিরতা বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট সামনে আরও গভীর হতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৬১ হাজার টন। অথচ গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৪৮ হাজার টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার টন।
অন্যদিকে একই সময়ে পাম অয়েলের আমদানি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে সয়াবিন তেলের ঘাটতি অন্য তেল দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ২৪ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ফলে আমদানিতে সামান্য ধাক্কাও সরাসরি বাজারে প্রভাব ফেলে।
আন্তর্জাতিক বাজার বনাম দেশীয় মূল্য
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১ হাজার ১৫৪ ডলার। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৮২ ডলারে এবং মার্চে পৌঁছে ১ হাজার ৪৮২ ডলারে।
আমদানিকারকদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশে খুচরা মূল্য সমন্বয়ের বিষয়ে সরকার দীর্ঘদিন সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল। ফলে ব্যবসায়ীরা লোকসানের আশঙ্কায় নতুন এলসি খোলা কমিয়ে দেন। এর প্রভাব এখন সরাসরি বাজারে পড়ছে।
একাধিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সূত্র জানায়, তারা কয়েক মাস ধরেই সরকারের কাছে মূল্য সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু কার্যকর সিদ্ধান্ত না আসায় অনেক প্রতিষ্ঠান আমদানি কমিয়ে দেয়। বাজারে এখন সেই ঘাটতির প্রভাব দৃশ্যমান।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতি ছিল?
অর্থনীতিবিদ ও বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। গত রমজানের আগ থেকেই বাজারে সরবরাহ ঘাটতির লক্ষণ ছিল। তখন যদি সরকার দ্রুত আমদানির উদ্যোগ, কর-শুল্ক সমন্বয়, মূল্য পুনর্নির্ধারণ বা কৌশলগত মজুত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিত, তাহলে পরিস্থিতি এতটা খারাপ নাও হতে পারত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল “প্রতিক্রিয়াশীল” বাজার ব্যবস্থাপনা। বাজারে সংকট তৈরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা থাকলেও আগাম পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা জানুয়ারিতেই স্পষ্ট হলেও সে অনুযায়ী নীতিগত প্রস্তুতি দেখা যায়নি।
তবে সরকারের একটি অংশ বলছে, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যয় ও ডলারের চাপও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি বলেছেন, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপের কারণে বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমেছে। তবে খোলা তেলের সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে এবং বাজার কারসাজি বরদাশত করা হবে না।
বাজারে সিন্ডিকেটের অভিযোগ
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাব অভিযোগ করেছে, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে দাম বাড়িয়েছে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া বলেন, কার্যকর তদারকির অভাবে বাজারে সিন্ডিকেট শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৯৫ থেকে ২০০ টাকায়। খোলা তেল ১৮২ থেকে ১৯০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। যদিও বাস্তবে অনেক এলাকায় এর চেয়েও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
সামনে ঈদ, বাড়ছে শঙ্কা
বাজার সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সামনে কোরবানির ঈদকে ঘিরে ভোজ্যতেলের চাহিদা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে। সাধারণত এ সময় গৃহস্থালি রান্না, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত খাতে তেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো—বাজারে এখনো সয়াবিন তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি, আমদানির গতিও প্রত্যাশিত পর্যায়ে ফেরেনি। ফলে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।
ব্যবসায়ী ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ঈদের আগে বাজারে বোতলজাত তেলের সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এতে খুচরা পর্যায়ে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও সিন্ডিকেটনির্ভর কারসাজির ঝুঁকিও বাড়বে। ইতোমধ্যে অনেক এলাকায় নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে তেল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে, যা ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির একটি আগাম সতর্কবার্তা বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এখনই সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে দ্রুত আমদানি বাড়াতে নীতিগত সহায়তা, ডলার ও এলসি জটিলতা নিরসন, বাজারে কঠোর তদারকি, অসাধু সিন্ডিকেট ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে অভিযান, টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে সরবরাহ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তাদের সতর্কবার্তা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সয়াবিন তেলের বর্তমান সংকট শুধু একটি পণ্যের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা সামগ্রিক খাদ্যপণ্য বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর।
সামনে ঈদ, বাড়ছে শঙ্কা, সংকট তৈরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়ার প্রবণতায় বিশৃঙ্খল সয়াবিন তেলের বাজার
- Tags : ঈদ, তর, তলর, নয়র, পর, পরবণতয়, বজর, বডছ, বযবসথ, বশঙখল, শঙক, সকট, সমন, সয়বন, হওয়র
Recent Posts

মেসি–স্কালোনি জুটি কি ভাঙার চেষ্টা করছে রিয়াল
April 29, 2026

নেছারাবাদে সমবায়ের নামে প্রতারণা, নিঃস্ব হাজারো পরিবার
April 29, 2026
Explore More Districts
- Khulna District Newspapers
- Chattogram District Newspapers
- Dhaka District Newspapers
- Barisal District Newspapers
- Sylhet District Newspapers
- Rangpur District Newspapers
- Rajshahi District Newspapers
- Mymensingh District Newspapers
- Gazipur District Newspapers
- Cumilla district Newspapers
- Noakhali District Newspapers
- Faridpur District Newspapers
- Pabna District Newspapers
- Narayanganj District Newspapers
- Narsingdi District Newspapers
- Kushtia District Newspapers
- Dinajpur District Newspapers
- Bogura District Newspapers
- Jessore District Newspapers
- Bagerhat District Newspapers
- Barguna District Newspapers
- Bhola District Newspapers
- Brahmanbaria District Newspapers
- Chuadanga District Newspapers
- Chandpur District Newspapers
- Chapainawabganj District Newspapers
- Coxs Bazar District Newspapers
- Feni District Newspapers
- Gaibandha District Newspapers
- Gopalganj District Newspapers
- Habiganj District Newspapers
- Jamalpur District Newspapers
- Jhalokati District Newspapers
- Jhenaidah District Newspapers
- Joypurhat District Newspapers
- Kurigram District Newspapers
- Kishoreganj District Newspapers
- Khagrachhari District Newspapers
- Lakshmipur District Newspapers
- Lalmonirhat District Newspapers
- Madaripur District Newspapers
- Magura District Newspapers
- Manikganj District Newspapers
- Meherpur District Newspapers
- Naogaon District Newspapers
- Munshiganj District Newspapers
- Moulvibazar District Newspapers
- Narail District Newspapers
- Natore District Newspapers
- Netrokona District Newspapers
- Nilphamari District Newspapers
- Panchagarh District Newspapers
- Patuakhali District Newspapers
- Pirojpur District Newspapers
- Rajbari District Newspapers
- Rangamati District Newspapers
- Satkhira District Newspapers
- Shariatpur District Newspapers
- Sherpur District Newspapers
- Sirajganj District Newspapers
- Sunamganj District Newspapers
- Tangail District Newspapers
- Thakurgaon District Newspapers
