দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যসেবার যে চিত্র দীর্ঘদিন ধরে নীরবে জমা হচ্ছিল, তা অবশেষে প্রকাশ্যে এলো এক আকস্মিক পরিদর্শনে। কাগজে-কলমে সেবা থাকলেও বাস্তবে রোগীদের জন্য চিকিৎসা যেন এক অনিশ্চিত প্রতীক্ষার নাম—এই অভিযোগই বারবার উঠে এসেছে ভুক্তভোগীদের মুখে।
শনিবার সকালে পরানখালি থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আরিফা সুলতানা বহির্বিভাগে এসে জানতে পারেন, মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক অনুপস্থিত। ক্ষোভ ঝরিয়ে তিনি বলেন, কয়েকদিন ধরে ঘুরেও চিকিৎসা পাননি। তাঁর মতো আরও অনেক রোগী দিনের পর দিন চিকিৎসকের অপেক্ষায় ফিরে যাচ্ছেন—যা একটি সরকারি হাসপাতালের জন্য উদ্বেগজনক বাস্তবতা।
রোগীদের এমন দুর্ভোগের তথ্য পেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান আকস্মিক পরিদর্শনে আসেন। পরিদর্শনে গিয়ে তিনি নিজেই দেখতে পান, বহির্বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুজন কনসালটেন্ট উপস্থিত নেই। কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়াই এই অনুপস্থিতিকে তিনি গুরুতর অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টদের শোকজ করার নির্দেশ দেন।
তবে চিকিৎসক অনুপস্থিতিই একমাত্র সমস্যা নয়—পরিদর্শনে উঠে আসে আরও গভীর অসঙ্গতি। রোগীরা অভিযোগ করেন, হাসপাতালে থাকা সেবা পেতে তাদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে।
সেবা নিতে আসা চৌকিদার হারুন-উর রশিদ আসকারী জানান, নিজের ও মায়ের ইসিজি করাতে গিয়ে হাসপাতালের ভেতরেই বাইরে থেকে মেশিন আনার নামে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়েছে। নওদাপাড়ার নিলুফা ইয়াসমিন অভিযোগ করেন, বিষপানের পর পাকস্থলী পরিষ্কারের জন্য তাঁর কাছ থেকে দুই হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল।
এসব অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি তাৎক্ষণিক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। পরে তিনি বলেন, কনসালটেন্টরা নিয়মিতই আসেন, তবে সপ্তাহের নির্দিষ্ট কয়েকদিন।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। গত দুই মাসে সংগৃহীত তথ্যে দেখা গেছে, অধিকাংশ কনসালটেন্টই নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। কেউ সপ্তাহে দুই-তিন দিন, কেউ বা চার দিন আসেন। এমনকি কেউ কেউ হাজিরা দিয়ে দ্রুত চলে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে হাসপাতালের সেবা কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে কয়েকটি দিনের মধ্যে, বাকি সময় রোগীরা চিকিৎসাবঞ্চিত থাকছেন।
এই পরিস্থিতি কেবল প্রশাসনিক শিথিলতারই ইঙ্গিত দেয় না; বরং পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জবাবদিহি সংকটকেও সামনে নিয়ে আসে। সরকারি হাসপাতালে যেখানে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হওয়ার কথা, সেখানে অনিয়ম, অনুপস্থিতি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ জনআস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
পরিদর্শন শেষে অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান সংশ্লিষ্টদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন এবং বিধি অনুযায়ী সব কনসালটেন্টকে সপ্তাহে ছয় দিন উপস্থিত থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি জেলা সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন।
তবে প্রশ্ন রয়ে যায়—এমন পরিদর্শন না হলে কি এই অনিয়মগুলো কখনো দৃশ্যমান হতো? আর নির্দেশনা দিয়েই কি বদলাবে এই দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা? ভেড়ামারার স্বাস্থ্যসেবার এই চিত্র এখন বৃহত্তর স্বাস্থ্যখাতের সংকটেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।


