| ৭ April ২০২৬ Tuesday ১:৫৫:৩৫ PM | |
বাউফল (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা:

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের একটি নতুন চরে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে সংঘটিত সহিংসতায় নিহত উজ্জল কর্মকার (৪০) ছিলেন সম্পূর্ণ নিরপরাধ। এমনটাই জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তার মর্মান্তিক মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে, আর স্বজনরা দাবি তুলেছেন দৃষ্টান্তমূলক বিচারের।
নিহত উজ্জলের বাড়ি উপজেলার কালাইয়া বন্দর এলাকায়। পেশায় তিনি স্বর্ণশিল্পী ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ হিসেবে পরিচিত উজ্জলের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপরাধ বা মামলা ছিল না।
উপজেলার মূল ভূ-খন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চারপাশে তেঁতুলিয়া নদী বেষ্টিত একটি ইউনিয়নের নাম চন্দ্রদ্বীপ। উপজেলা থেকে যোগাযোগের একমাত্র পথ নৌপথ। ছোট লঞ্চে আধাঘন্টা পাড়ি দিয়ে যেতে হয় চন্দ্রদ্বীপে। ওই চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চরওয়াডেল এলাকার পূর্ব পাশের তেঁতুলিয়া নদীতে নতুন চর জেগেছে। সেখানেও ইঞ্জিন চালিত ট্রলারে করে যেতে সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ মিনিট। ওই চরের কৃষক ফিরোজকে গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) উপজেলার মূল ভূ-খন্ড থেকে কয়েক যুবক গিয়ে পিটিয়ে আহত করে। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিন ব্যক্তিকে পিটিয়ে আহত করে ফিরোজের স্বজন ও স্থানীয় কয়েকজন। পরে আহতদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে এলে উজ্জলকে মৃত ঘোষণা করে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক।
উজ্জলকে বহন করা ইঞ্জিন চালিত নৌকার চালক চন্দ্রদ্বীপের সরকারি পুকুরপাড়ের গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা মো. আশরাফ হাওলাদার (৩৫) বলেন, তার ট্রলারে করে ঘটনার দিন মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দুপুরের দিকে কালাইয়া বন্দরের ব্যবসায়ী মো. সিরাজুল ইসলামের ছেলে মো. মিজানুর রহমান (৪৫) ও উজ্জল কর্মকারসহ পাঁচজন চরওয়াডেলের পূর্ব পাশের চরে যান। তখন উজ্জলের সঙ্গে তার (আশরাফ) কথা হয়। উজ্জল তখন তাকে জানিয়ে ছিলেন জীবনে কখনও এই চরে আসেননি। তাদের (মিজান) সঙ্গে এসেছেন ঘুরতে এবং যাবার সময় তরমুজ ক্রয় করে নিয়ে যাবেন। নৌকা থেকে চরে নেমে মিজানুর ও তার সঙ্গে থাকা শামীম নামের আরেকজন তরমুজ চাষী ফিরোজ গাজীর সঙ্গে তর্কে জড়ান। এক পর্যায়ে ফিরোজ গাজীকে মারধর করেন মিজানুর ও শামীম। কিন্তু উজ্জল কোনো মারামারি কিংবা কথা-কাটাকাটিতেও ছিলেন না। বরং তিনি সবাইকে শান্ত হতে বলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী মো. আলমগীর হোসেন (৫৩) বলেন,ওই চরে তার ত্ত্ববধানে ২৫ একর জমিতে তরমুজ চাষাবাদ হয়েছে। ঘটনার সময় ওই চরে তারা অটজন ব্যক্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে তরমুজ খেতে কাজ করছিলেন। ফিরোজ গাজী ওই চরের দুই একর জমিতে তরমুজ চাষ করেন। তিনি তার খেতের তরমুজ কেটে ট্রলারে উঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় বিকেল তিনটার দিকে মিজানুর ফিরোজের সঙ্গে বিবাদে জড়ান এক পর্যায়ে ফিরোজকে মেরে আহত করেন। তবে নিহত ব্যক্তি (উজ্জল) কোনো মারামারিতে ছিলেন না।
পরে ফিরোজকে উদ্ধার করে নৌকায় করে চরওয়াডেল খানকা এলাকায় পাঠানো হয়। সেখান থেকে তার স্বজনেরা ট্রলারে করে উপজেলা স্বস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠান। সেখান থেকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসাপতালে পাঠানো হয়।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক মো. রাশেদুল (২৫) বলেন, নিহত ব্যক্তি (উজ্জল) কোনো মারামারিতে অংশ নেয়নি। আর ফিরোজকে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় দফায় মারামারি ঘটনা ঘটে। তখন পিটুনিতে নিরপরাধ উজ্জল গুরুতর আহত হন। পরে তাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে উজ্জল মারা যায়।
উজ্জলকে বহন করা ইঞ্জিন চালিত নৌকার চালক আশরাফ হাওলাদার আরও বলেন,ফিরোজকে মারধরের খবর পেয়ে ইঞ্জিন চালিত তিনটি নৌকায় করে ফিরোজ গাজীর ছোট ভাই মো. জালাল গাজী (৩৫),মো. সোহাগ মুন্সি (২৫), মো. ইয়াছিন (৩৫), মো. রবিউল (২৫) ও আলীমত গাজীর (৩০) নেতৃত্বে ১২-১৪ জনের একটি দল লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে মিজানুর, শামীম ও উজ্জলকে পিটুনি দেয়। বাকি দুজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। নিরাপরাধ উজ্জলকে নির্দয়ভাবে যেভাবে পিটানো হয়েছে তা দেখে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। প্রায় আধা ঘন্টা পর তার জ্ঞান ফিরে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চন্দ্রদ্বীপের বাসিন্দা এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, উজ্জল হত্যাকান্ডের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা আহত অবস্থায় উজ্জলসহ মিজান ও শামীকে পিটিয়ে খেতের মধ্যে ফেলে রাখে। স্থানীয় পুলিশ ক্যাম্পে কোন সংবাদ দেয়নি। অভিযুক্তদের প্লান ছিল রাত হলে ডাকাত বলে প্রচার করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া।
কালাইয়া বন্দরের ব্যবসায়ী ও পরিবেশক সমিতির সভাপতি মো. মাসুম ছিদ্দিকী বলেন,‘ছোটবেলা থেকে উজ্জলকে চিনি। উজ্জল একজন ভদ্র ও বিনয়ী স্বভাবের মানুষ ছিলেন। যতটুকু জেনেছি উজ্জল জীবনে প্রথম চন্দ্রদ্বীপে ঘুরতে গিয়েছিলেন। ফিরলেন লাশ হয়ে। এটা খুবই কষ্টের। ভিটেমাটিটুকুও নেই তার। উজ্জলের মা, স্ত্রী ও একটি নয় বছরের কন্যা শিশু রয়েছে।’ তিনি উজ্জলের খুনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
উজ্জলের নয় বছরের কন্যা সন্তান বলে,‘বাবা চরে ঘুরতে যাবেন। আসার সময় তরমুজ কিনে আনবেন- একথা শুনে যেতে নিষেধ করেছিলাম। এরপরেও বাবা গিয়েছেন। তাকে যারা খুন করেছে, আমি তাদের শাস্তি চাই, বিচার চাই।’
উজ্জলের স্বজন ইত্তেফাকের সাংবাদিক কৃষ্ণ কান্ত কর্মকার বলেন,‘তার ভাতিজা উজ্জলের বিরুদ্ধে কারো কাছ থেকে কোনোদিন কোনো অভিযোগের কথা শুনেননি। তাকে নির্দয়ভাবে যেভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে তা খুবই কষ্টদায়ক।’ তিনি আরও বলেন,এ ঘটনায় নিরাপরাধ কেউ যেনো হয়রানি না হয়। প্রকৃত খুনিদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
এ ঘটনায় গত বুধবার রাতে নিহত উজ্জলের বড় ভাই অমৃত কর্মকার বাদী হয়ে ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১৫-২০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির নামে বাউফল থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন।
বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন,‘প্রধান আসামিসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেফতারে চেষ্টা অব্যাহত আছে। কোনোভাবেই নিরাপরাধ কাউকে হয়রানি করা হবে না।’
সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক
| শেয়ার করতে ক্লিক করুন: | Tweet |

