
ওয়াশিংটন, ৬ এপ্রিল – ১৯৬৯ সালে নাসার যে দল প্রথমবারের মতো দুজন মহাকাশচারীকে চাঁদে পাঠিয়েছিল, তাদের পুরো ব্যবস্থার চেয়ে বর্তমানে মানুষের হাতের মোবাইল ফোনে বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা রয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানী মিচিও কাকুর এই বক্তব্য আধুনিক প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য উন্নতির বিষয়টি তুলে ধরে। অ্যাপোলো এগারো অভিযানের সময় নীল আর্মস্ট্রং যখন চাঁদের বুকে পা রাখেন, সেটি ছিল মানব ইতিহাসের এক বিশাল মাইলফলক। অ্যাপোলো মিশনের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত চব্বিশ জন নাসা মহাকাশচারী চাঁদে ভ্রমণ করেছেন।
তবে ১৯৭২ সালের পর থেকে আর কোনো মানুষ এই উপগ্রহে পা রাখেনি। অবশেষে দীর্ঘ বিরতির পর আর্টেমিস নামের নভোযানের মাধ্যমে নাসা ফের চাঁদে মানুষ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ফ্লোরিডা থেকে চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা করা এই মিশনকে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে আর্টেমিস দুই মিশনের চারজন মহাকাশচারীর কেউই এখনই চাঁদের পৃষ্ঠে পা রাখবেন না। চাঁদের বুকে মানুষের পা পড়ার জন্য অন্তত আর্টেমিস চার মিশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, যা ২০২৮ সালে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
আর্টেমিস দুই মিশনের চাঁদে অবতরণের সময়সীমা ২০২৪ সালের নভেম্বরে নির্ধারিত থাকলেও নানা প্রযুক্তিগত জটিলতায় তা পিছিয়ে যায়। এই মিশনে নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ক্রিস্টিনা কচ, ভিক্টর জে গ্লোভার এবং জেরেমি হ্যানসেন ওরিয়ন মহাকাশযানে দশ দিনের যাত্রা করবেন। তারা ভবিষ্যতে অবতরণের প্রস্তুতি হিসেবে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করবেন এবং বিভিন্ন মহাকাশ কৌশল অনুশীলন করবেন। মূলত আগামী বছর আর্টেমিস তিন মিশনের উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে যে, পঞ্চাশ বছর আগেই আমেরিকা যা অর্জন করেছিল, তা পুনরায় করতে এত পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন কেন হচ্ছে। মানবজাতির চাঁদে পদার্পণের সেই বিশাল কীর্তি শুধু বৈজ্ঞানিক নয়, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয় এনে দেয়। তবে বিপুল ব্যয়ের কারণে পরবর্তী সময়ে চন্দ্রাভিযানের অগ্রাধিকার কমে যায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই মহাকাশ অভিযানের জন্য স্থিতিশীল রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং নিরবচ্ছিন্ন তহবিল অপরিহার্য, যা অ্যাপোলো কর্মসূচির পর যুক্তরাষ্ট্র ধরে রাখতে পারেনি। বর্তমানে আর্টেমিস প্রোগ্রামের মাধ্যমে নাসা সেই সামঞ্জস্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। এই প্রকল্পে হাজার হাজার মানুষ যুক্ত রয়েছেন এবং এর আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় তিরানব্বই বিলিয়ন মার্কিন ডলার। নতুন এই কর্মসূচির লক্ষ্য কেবল চাঁদে পা রাখা নয়, বরং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানববাহী অভিযানের পথ প্রশস্ত করা। নাসা চাঁদের কক্ষপথে একটি মহাকাশ স্টেশন এবং পৃষ্ঠে একটি স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। ইলন মাস্কের স্পেসএক্স এবং জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিন নভোচারীদের চন্দ্র পৃষ্ঠে অবতরণের যান বা ল্যান্ডার তৈরির কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীনও ২০৩০ সালে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মানববাহী অভিযানের পরিকল্পনা করেছে। ফলে মহাকাশ নিয়ে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। চাঁদের অমূল্য সম্পদ যেমন বিরল ধাতু ও জলের সন্ধান এই প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করেছে।
আর্টেমিস দুই মিশনের অন্যতম আকর্ষণ হলো চাঁদের অন্ধকার অংশের অনুসন্ধান। চার নভোচারী সশরীরে চাঁদের সেই দূরবর্তী অংশ পর্যবেক্ষণ করবেন, যা পৃথিবী থেকে কখনোই দেখা যায় না। প্রাচীন লাভা প্রবাহ এবং বিশাল গর্ত সংবলিত এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক গঠন বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত কৌতূহলের বিষয়। নাসা জানিয়েছে, আর্টেমিস দুই তিন ঘণ্টা ধরে এই রহস্যময় এলাকার ওপর দিয়ে উড়ে যাবে। মহাকাশচারী ক্রিস্টিনা কচের মতে, মানুষের চোখ অন্যতম সেরা বৈজ্ঞানিক যন্ত্র, যা এই মিশনের মাধ্যমে নতুন আবিষ্কারের দুয়ার খুলে দেবে। মানবজাতির মহাকাশ বিজয়ের ইতিহাসে এটি আরও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে।
এস এম/ ৬ এপ্রিল ২০২৬




